একটি লিফলেট ও প্রতারণা…যে এই লেখা ছাপাবে !

Scan

►►►মসজিদ থেকে বের হলেন, দেখলেন একজন আপনাকে গছিয়ে দিল একটি লিফলেট, যাতে লেখা…”যে এই অসিয়তনামা ছাপাবে…তার এই হবে আর যদি কেউ না ছাপায় তাহলে তার…এই এই হবে” কি করবেন ?? এগুলো কতটুকু সত্য? আসুন পড়ে দেখি ও নিজেদের দীনকে মূর্খতা ও তামাশার হাত থেকে রক্ষা করি

মসজিদে নববীর কথিত খাদেম শায়খ আহমাদের কাল্পনিক স্বপ্নের অপনোদন

আলোচ্য রিসালাটি আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বাজের পক্ষ থেকে যারা এ বিষয়ে অবগত হয়েছেন তাদের নিকট আল্লাহ তাদের দীনকে হেফাজত করুন এবং তিনি আমাদের ও তাদেরকে অজ্ঞতা ও হীন মানসিকতার অকল্যাণ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

আমি মসজিদে নববী শরিফের কথিত খাদেম শায়খ আহমদের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি লিফলেট সম্পর্কে অবহিত হই।

►যার শিরোনাম: এটা মদীনা মোনাওয়ারা থেকে মসজিদে নববী শরিফের খাদেম শায়খ আহমদের পক্ষ থেকে একটি অসিয়ত নামা

►-অসিয়ত নামার সংক্ষিপ্ত বিবরণ

“আমি জুময়ার রাতে জাগ্রত অবস্থায় কুরআনে কারীম তেলাওয়াত করছিলাম এবং আল্লাহর আসমায়ে হুসনা বা সুন্দর নামসমূহ তেলাওয়াত শেষ করে যখন ঘুমের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি এমতাবস্থায় নয়ন জুড়ানো সুদর্শনের মূর্ত প্রতীক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখলাম। যিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নেতা, কুরআনের আয়াত ও শরিয়তের বিধি-বিধানসহ সমস্ত জগতের প্রতি রহমত স্বরূপ এসেছিলেন।

তারপর তিনি বলেন: ওহে শায়খ আহমাদ! আমি বললাম: লাব্বাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ, হে আল্লাহর সৃষ্টির সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন: আমি মানুষের অপকর্মে দারুণ লজ্জিত, আমি আমার প্রতিপালক ও ফিরেশতাদের সাথে এ অবস্থায় সাক্ষাত করতে পারব না। কারণ, এক জুময়া থেকে দ্বিতীয় জুময়া পর্যন্ত এক লক্ষ ষাট হাজার লোক বেদীন হয়ে মারা গেছে। অতঃপর মানুষ যে সমস্ত পাপে নিপতিত তার কতিপয় তিনি বর্ণনা করেন, তার পর বলেন: তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমত স্বরূপ এটা একটি অসিয়তনামা। অতঃপর তিনি কিয়ামতের কতিপয় আলামত বর্ণনা করেন… এভাবে আরো কিছু বর্ণনার পর বলেন: হে শায়খ আহমাদ! তাদেরকে এই অসিয়ত সম্পর্কে জানিয়ে দাও, কারণ, এটা লাওহে মাহফূজ থেকে ভাগ্যলিপি স্বরূপ বর্ণিত। আর যে ব্যক্তি এ অসিয়ত নামা ছাপাবে এবং তা এক দেশ থেকে অন্য দেশ ও একস্থান থেকে অন্যস্থানে পাঠাবে তার জন্য জান্নাতে একটি বালাখানা তৈরী করা হবে। আর যে তা ছাপিয়ে প্রচার করবে না তার জন্য কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াত হারাম। যে ব্যক্তি তা ছাপাবে, যদি সে ফকীর হয় আল্লাহ তাকে ধনী করবেন অথবা যদি ঋণগ্রস্থ হয় আল্লাহ তার ঋণ পরিশোধ করে দিবেন অথবা যদি তার গুনাহ থাকে তবে আল্লাহ এ অসিয়তের বরকতে তাকে ও তার পিতামাতাকে ক্ষমা করে দিবেন। আর আল্লাহর যে বান্দা তা ছাপাবে না দুনিয়া ও আখেরাতে তার চেহারা কাল হয়ে যাবে।

তারপর সে বলল: আল্লাহ আকবার (তিনবার) এটা সত্য ঘটনা, আর যদি আমি মিথ্যাবাদী হই তবে দুনিয়া থেকে আমি বেদীন হয়ে বিদায় হব। আর যে এটা সত্য মনে করবে সে জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি পাবে আর যে তা মিথ্যা মনে করবে সে কুফরি করবে।

এ হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর মিথ্যা অপবাদে ভরপুর অসিয়তনামার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

►►►ভ্রান্ত অসিয়ত নামার জবাব

আমরা এ মিথ্যা অসিয়ত কয়েক বছর থেকে অনেকবার শুনেছি যা সাধারণ মানুষের মাঝে বিভিন্ন সময় বিভন্নভাবে প্রচার করা হচ্ছে। যার বক্তব্যের মাঝে রয়েছে গড়মিল। যেমন মিথ্যাবাদী অসিয়তকারী বলে: সে নবী সাল্লাল্লাহুয় আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিদ্রায় দেখেছে, অতঃপর তিনি তাকে এ অসিয়তনামা প্রদান করেন। আর এ অসিয়তনামার সর্ব শেষ রয়েছে যে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তখন দেখে, যখন সে নিদ্রার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঘুমের মধ্যে নয়, অতএব, অর্থ দাঁড়াল সে তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছে।

►এ অসিয়তের মাধ্যমে এ মিথ্যুক বহু অবান্তর ধারনার জন্ম দিয়েছে, যা স্পষ্ট মিথ্যা ও বাতিল। সে সম্পর্কে আমি নিম্নে আলোচনা করছি।

►আমি এর মিথ্যা ও বাতুলতা সম্পর্কে বিগত বছরে লোকদেরকে সতর্ক করেছি। সর্বশেষ আমি যখন এ লিফলেট সম্পর্কে অবগত হই, তখন আমার মনে হল যে, এ ব্যাপারে কিছু লিখব কিনা? কারণ, এর অসারতা ও বাতুলতা এবং এ মিথ্যার জন্মদানকারীর দুঃসাহস অবশ্যই প্রতিহত করার মত। আমি ভাবতেও পারিনি যে এর পাগলামী সামান্য অন্তর্দৃষ্টি ও সঠিক জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির নিকট প্রশ্রয় পেতে পারে। তবও অনেকের নিকট জানতে পারলাম যে, এ ঘটনা অধিকাংশ লোকের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে ও তাদের পরস্পরের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে এবং তাদের কেউ কেউ একে সত্যও মনে করছে।

এসব কারণে আমি দেখলাম যে, বিষয়টির ভ্রান্ততা প্রকাশ করার জন্য আমার কিছু লিখা প্রয়োজন। কারণ, এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর মিথ্যা অপবাদ, এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করা প্রয়োজন। জ্ঞানী, ইমানদার, সঠিক বিবেক সম্পন্ন ও প্রকৃত স্বভাবের লোক এ ব্যাপারে সামান্য চিন্তা করলে বুঝতে পারবে যে এটা মিথ্যা ও বানোয়াট।

►►আমি শায়খ আহমদ তথা এ মিথ্যাচার যার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় তার কতিপয় আত্মীয়-স্বজনকে এঅসিয়তের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তারা জবাব দেয় যে এটা অবশ্যই শায়খ আহমাদের ওপর মিথ্যারোপ। তিনি কখনও তা বলেননি। উল্লেখিত শায়খ আহমদ অনেক দিন পূর্বে ইন্তিকাল করেন।

যদিও আমরা মেনে নেই যে শায়খ আহমদ বা তার চেয়ে বড় কেউ নিদ্রায় বা জাগ্রত অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছেন এবং তিনি তাকে এ অসিয়ত করেছেন, তবুও আমরা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করব যে, এটা মিথ্যা অথবা শয়তান তাকে প্রতারিত করেছে এবং তিনি যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না তারও বহু কারণ রয়েছে। যথা :

►►►প্রথম কারণ: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামতাঁর ইন্তিকালের পর জাগ্রত অবস্থায় দেখা সম্ভব নয়। যারা সূফীবাদের অজ্ঞতার শিকার হয়ে বলবে যে, সে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছে অথবা তিনি মিলাদ মাহফিলে উপস্থিত হন বা এ ধরনের অন্য কিছু ঘটে, তবে জ্ঞান করতে হবে তারা পথভ্রষ্ট।
তারা এ ধারণা পোষণ করে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নত এবং আলেমদের ঐক্যমতের বিরোধিতা করল। কারণ, মৃত ব্যক্তিরা একমাত্র কিয়ামতের দিন তাদের কবর থেকে বের হবে। পৃথিবীতে তার পূর্বে আর বের হবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: – “এরপর অবশ্যই তোমরা মরবে। তারপর কিয়ামতের দিন অবশ্যই তোমরা পুনরুত্থিত হবে।” (মুমিনূন:১৫-১৬)

সুতরাং আল্লাহ তাআলা খবর দিয়েছেন যে, মৃতদের পুনরুত্থান হবে কিয়ামতের দিন, পৃথিবীতে নয়। আর যে এর ব্যতিক্রম বলবে সে মিথ্যাবাদী, ভুলের মধ্যে নিপতিত বা তার মতিভ্রম ঘটেছে। সে এ সত্য বুঝতে অক্ষম যা সালাফে সালেহিন বুঝেছেন এবং যার ওপর রাসূলের সাহবাগণ ও তাঁদের অনুসারীগণ চলেছেন।

►►►দ্বিতীয় কারণ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর হক বা সত্যের বিপরীত কখনও বলেননি, অথচ এ অসিয়তনামা বিভিন্নভাবে তাঁর শরিয়তের সরাসরি বিরোধী।

যেমন: নবী সাল্লাল্লাহুয় আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কখনও কখনও স্বপ্নে দেখা যায়, আর যে ব্যক্তি স্বপ্নে তাঁর আকৃতি মুবারক দেখল সে যেন তাঁকেই দেখল, শয়তান তাঁর আকৃতি ধারন করতে পারে না। সহিহ হাদিস দ্বারা এটাই প্রমাণিত। তবে এ ব্যাপারগুলো যে স্বপ্ন দেখবে তার ঈমান, সত্যবাদীতা, ন্যায়পরায়ণতা, স্মৃতিশক্তি, দীনদারী ও আমানতদারীর ওপর নির্ভরশীল। কথিত এ ব্যক্তির ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখল? নাকি (তাঁর নামে) অন্য আকৃতি দেখল?

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস যদি অনির্ভর ও দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হয়, তবে তার ওপর নির্ভর করা যায় না এবং তা দিয়ে দলিলও পেশ করা যায় না। অথবা কোন হাদিস নির্ভর যোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েও যদি এর চেয়ে শক্তিশালী কোন সূত্রের বর্ণিত হাদিসের বিপরীত হয় এবং উভয় বর্ণনার মাঝে সমন্বয় সাধন সম্ভব না হয় তবে দুটির মধ্যে

একটি হবে মানসূখ যার ওপর আমল করা যাবে না,
দ্বিতীয়টি হবে নাসেখ যার ওপর শর্ত সাপেক্ষে আমল করা যাবে।

আর যদি তা সম্ভব না হয় তবে যে বর্ণনার সূত্র তুলনামূলক দুর্বল তা বর্জন করা হবে।
অতএব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনাকৃত এ অসিয়তের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত হতে পারে? যার অসিয়তকারী অজ্ঞাত এবং যার আমানতদারী অজ্ঞাত…, নিশ্চয় তা বর্জনীয় এবং এর দিকে ভ্রুক্ষেপ করা হবে না। যদিও তাতে শরিয়ত বহির্ভুত কোন কিছু না থাকে। আর যে অসিয়তনামা এমন অলীক বিষয় সম্বলিত যার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে, এ অসিয়তনামা ভ্রান্ত, এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র ওপর মিথ্যারোপ এবং আল্লাহ তাআলার শরিয়তের বহির্ভূত, তার ওপর কিভাবে বিশ্বাস করা যায়।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি আমি যা বলিনি এমন কিছু বলল সে যেন তার স্থান জাহান্নামে করে নেয়”।( হাদিসটির অন্যান্য বর্ণনাও রয়েছে যেমন: যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যারোপ করল সে যেন তার স্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়। (বুখারী – মুসলিম এবং এটি ইমাম আহমাদ, তিরমিজি, নাসায়ি ও ইবনে মাজাহ বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেছেন, প্রত্যেক সূত্রই বিশুদ্ধ)

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেননি এ মিথ্যুক তাঁর নামে তাই রটনা করেছে এবং তাঁর প্রতি স্পষ্ট মিথ্যারোপ করেছে। অতএব, সে যদি তা থেকে তওবা না করে এবং মানুষের মাঝে এ অসিয়তের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওপর যে মিথ্যারোপ করা হয়েছে তা প্রকাশ না করে তবে তার প্রতি এ কঠোরতা ও হুশিয়ারী যথাযথ বর্তাবে। কারণ, যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে বাতিল কিছু প্রচার করল এবং তা দীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করল তার তওবা ঘোষণা ও প্রচার করা ব্যতীত কবুল হয় না। যাতে মানুষ তার প্রচারিত মিথ্যা থেকে হেফাজত থাকতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
“নিশ্চয় যারা গোপন করে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ ও হিদায়েত যা আমি নাযিল করেছি, কিতাবে মানুষের জন্য তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর, তাদেরকে আলাহ লা’নত করেন এবং লা’নতকারীগণও তাদেরকে লা’নত করে। তারা ছাড়া, যারা তাওবা করেছে, শুধরে নিয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। অতএব, আমি তাদের তাওবা কবূল করব। আর আমি তাওবা কবূলকারী, পরম দয়ালু”। (বাকারা:১৫৯-১৬০)

এ আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, যে ব্যক্তি সত্যের সামান্যতম গোপন করবে তা সংশোধন ও প্রকাশ করা ব্যতীত তার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য দীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওপর অহি প্রেরণ করে তাঁর নিয়ামতসমূহ সম্পূর্ণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম”। (মায়িদা:৩)

এ অসিয়তের মাধ্যমে মিথ্যাবাদী ১৪শত হিজরিতে এসে চায় দীনের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে এবং তাদের জন্য এক নতুন শরিয়ত প্রবর্তন করতে, যে তার শরিয়ত মেনে চলবে তার জন্য জান্নাত আর যে তার শরিয়ত মেনে চলবে না তার জন্য জাহান্নাম !

সে এ বানোয়াট অসিয়তকে কুরআনের চেয়ে বড় এবং শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে চায়। সে এ অসিয়তের মধ্যে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে, “যে ব্যক্তি তা ছাপাবে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশ এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছাবে তার জন্য জান্নাতে একটি বালাখানা নির্মাণ করা হবে, আর যে তা ছাপিয়ে বিতরণ করবে না সে কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুপারিশ থেকে বঞ্চিত হবে” এটা সব চেয়ে জঘন্য মিথ্যা।
এ অসিয়ত মিথ্যা হওয়ার এবং অসিয়তকারীর নির্লজ্জ হওয়ার জলন্ত প্রমাণ।

কারণ, যে ব্যক্তি কুরআন শরিফ ছাপাল ও একস্থান থেকে অন্যস্থানে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিতরণ করল সে ব্যক্তি এ ফজিলতের অধিকারী হবে না, যদি সে কুরআনের ওপর আমল না করে। অতএব, এ মিথ্যার প্রকাশক ও একদেশ থেকে অন্য দেশ এর প্রচারক কিভাবে এই ফজিলত অর্জন করবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কুরআন না ছাপায়, এক দেশ থেকে অন্য দেশে না পাঠায়, কিন্তু সে ইমানদার, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শরিয়তের অনুসারী, সেও তাঁর সুপারিশ থেকে বঞ্চিত হবে না।

এ মিথ্যাই আলোচ্য অসিয়তনামা ভ্রান্ত হওয়ার জন্য এবং তার প্রকাশকের মিথ্যুক হওয়ার জন্য ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনিত হিদায়েতের জ্ঞান থেকে অজ্ঞ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

এ অসিয়ত সম্পর্কে যা কিছু বর্ণনা করা হয়েছে এবং এতে আরো যা কিছু রয়েছে তাই এর ভ্রান্ত ও মিথ্যা প্রমাণ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। যদিও এ মিথ্যুক তার অসিয়তের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য হাজার শপথ করে এবং এর ব্যত্যয় হলে নিজের জন্য সবচেয়ে বড় আযাব ও কঠিণ শাস্তির বদদোয়া করে তবুও তা সত্য ও বিশুদ্ধ হবে না। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এটা বড় ধরনের মিথ্যা ও জঘন্য ভ্রান্তি।

এ ব্যাপারে আমরা আল্লাহ তাআলাকে এবং আমাদের নিকট উপস্থিত ফেরেশতাগণকে ও এ ব্যাপারে অবগত সকল মুসলিমকে সাক্ষী রাখলাম। কেয়ামতের দিন আমরা এ দাবি নিয়ে আমাদের রবের সাথে মিলিত হবো, যে এ অসিয়তনামা মিথ্যা এবং তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওপর জঘন্য অপবাদ। আল্লাহ তাআলা এ মিথ্যুককে লাঞ্চিত করুন এবং তাকে তার উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করুন।

►►►উল্লেখিত বিষয় ব্যতীত আরো কতগুলো বিষয় রয়েছে যা এ অসিয়তনামা মিথ্যা ও ভ্রান্ত হওয়ার প্রমাণ বহন করে। নিম্নে আমরা তার কয়েকটি উল্লেখ করছি।

►১। আলোচ্য অসিয়তের বক্তব্য:

“ জুময়া থেকে অন্য জুময়ার মধ্যে ১লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ বেদীন হয়ে মারা গেছে”।

এটা ইলমে গায়েবের খবর, যে সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মৃত্যুর পর অহির সিলসিলা বন্ধ হয়ে গেছে, দ্বিতীয়ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত অবস্থায়ও গায়েব জানতেন না, তাই প্রশ্ন, তাঁর মৃত্যুর পর এ গায়েব জানা কিভাবে সম্ভব হল!?
আল্লাহ তাআলা বলেন: “বল, ‘তোমাদেরকে আমি বলি না, আমার কাছে আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ রয়েছে এবং আমি গায়েব জানি না”। (সূরা: আনয়াম:৫০)
তিনি আরও বলেন: “বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও যমীনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না”। (নামল:৬৫)

সহিহ হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: কিছু লোককে আমার হাউজে কাউসার থেকে কিয়ামতের দিন তাড়িয়ে দেয়া হবে তখন আমি বলব: হে আমার রব! “তারা আমার উম্মত, তারা আমার উম্মত”, তখন আমাকে বলা হবে: তুমি জান না তোমার মৃত্যুর পর তারা তোমার শরিয়তে কত বিদআত আবিস্কার করেছে! এ কথা শুনে আমি তাই বলব যা ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন। অর্থাৎ “আর যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে উঠিয়ে নিলেন তখন আপনি ছিলেন তাদের পর্যবেক্ষণকারী। আর আপনি সব কিছুর উপর সাক্ষী”। (মায়িদা:১১৭)

►►২। আলোচ্য অসিয়তনামা ভ্রান্ত হওয়ার দ্বিতীয় প্রমাণ:
“যে ব্যক্তি এটা ছাপাল যদি সে দরিদ্র হয় তাকে আল্লাহ ধনী করে দিবেন, অথবা যদি ঋণগ্রস্থ হয় তবে আল্লাহ তার ঋণ পরিশোধ করে দিবেন অথবা তার যদি কোন গুনাহ থাকে তবে আল্লাহ তাকে ও তার পিতামাতাকে এ অসিয়তের বরকতে ক্ষমা করে দিবেন”।

এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। বরং এ মিথ্যুক যে আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের নিকট খুবই নির্লজ্জ তার বড় প্রমাণ এ অসিয়ত। কারণ, এ প্রতিশ্রুতি তো কুরআন শরিফ ছাপালেও অর্জিত হবে না, সেখানে এ ভ্রান্ত অসিয়তনামা ছাপালে কিভাবে এ প্রতিশ্রুতির আশ্বাস দেয়া হয়!?

অবশ্য আমাদের কাছে স্পষ্ট যে, এ খবীস আলোচ্য অসিয়তের মাধ্যমে মানুষকে ধোকায় ফেলে আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়ত থেকে বিচ্যুত করতে চায়। শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত পন্থার বাইরে ধনী হওয়ার, ঋণ পরিশোধ হওয়ার ও গুনাহ মাফের অন্য পদ্ধতি বাতলে দিয়ে সকলকে গোমরাহ করতে চায়।
আমাদের প্রার্থনা, হে আল্লাহ, তুমি আমাদের লাঞ্চনার পথ, শয়তানের পথ ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্ত কর।

►►৩। আলোচ্য অসিয়তনামা ভ্রান্ত হওয়ার তৃতীয় প্রমাণ:
“আল্লাহর যে বান্দা এটা না ছাপাবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তার চেহারা কাল হয়ে যাবে”!
এটা একটা নিছক মিথ্যা কথা। এটাও এ অসিয়ত ভ্রান্ত ও অসিয়তকারীর মিথ্যুক হওয়ার জ্বলন্ত প্রমাণ। কোন জ্ঞানী ব্যক্তির বিবেক তা মেনে নিতে পারে না, যে ব্যক্তি এ অসিয়ত না ছাপাবে (যা ১৪শত হিজরির এক অজ্ঞাত ব্যক্তি বর্ণনা করেছে এবং যা মূলত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওপর মিথ্যারোপ) দুনিয়া ও আখেরাতে তার চেহারা কাল হয়ে যাবে আর যে ছাপাবে সে দরিদ্র থেকে ধনীতে পরিণত হবে, ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পাবে এবং সে যে গুনাহ করেছে তা থেকে পরিত্রাণ পাবে,
‘সুবহানাল্লাহ’ এটা বড় ধরনের অপবাদ।

এসব দলিল ও বাস্তবতার নিরিখে বলা যায় যে, এ অসিয়তকারী মিথ্যুক তার এ অসিয়ত আল্লাহর ওপর মিথ্যা প্রকাশের দুঃসাহস। অধিকন্তু সে আল্লাহর ব্যাপারে নির্ভয় এবং মানুষের সামনে সে খুবই নির্লজ্জ। লক্ষণীয় যে, অনেকেই তো এ অসিয়তনামা ছাপায়নি তবুও তাদের চেহারা কাল হয়নি। আবার অনেক লোক পাওয়া যাবে যারা এ অসিয়ত বহুবার ছাপিয়েছে কিন্তু তাদের ঋণ পরিশোধ হয়নি, তারা এখনো দরিদ্রই রয়ে গেছে। আমরা আল্লাহর নিকট অন্তরের বক্রতা, গোনাহের মরিচা ও যা পবিত্র শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত নয়, তা থেকে আশ্রয় চাই।

আশ্চর্যের ব্যাপার! যে মহাগ্রন্থ আল কুরআন ছাপাবে সে এ ফজিলতের অধিকারী হবে না, অথচ কুফরিতে ভরা এ মিথ্যা অসিয়তনামা ছাপালে এ ফজিলতের অধিকারী হবে? সুবহানাল্লাহ!! অবাক কাণ্ড !
মিথ্যার ওপর কত বড় দুঃসাহসীকতার প্রকাশ!

►►৪। আলোচ্য অসিয়তনামা ভ্রান্ত হওয়ার চতুর্থ প্রমাণঃ
“যে ব্যক্তি তা বিশ্বাস করবে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে আর যে মিথ্যা মনে করবে সে কুফরি করবে”। এটাও তার মিথ্যাচারের দুঃসাহস এবং ভ্রান্তির পরিচায়। এ মিথ্যাবাদী তার এ অসিয়ত বিশ্বাস করার জন্য সকলকে আহবান জানাচ্ছে। এবং প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, তারা এর মাধ্যমে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি পাবে এবং যে তা মিথ্যা মনে করবে সে কুফরি করবে।

মারাত্মক কথা! আল্লাহর শপথ এ মিথ্যাবাদী আল্লাহর ওপর বড় অপবাদ দিয়েছে, আল্লাহর শপথ সে মিথ্যা বলেছে, যে ব্যক্তি তা বিশ্বাস করবে সে কাফের। কারণ, এটা একটা অপবাদ, এটা মিথ্যা যার শুদ্ধতার ব্যাপারে কোন দলিল নেই। আমরা আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, এটা নিশ্চিত মিথ্যা, এর রচনাকারী মিথ্যুক। সে এর মাধ্যমে আল্লাহর শরিয়ত বিকৃত করতে চায় এবং দীনের মধ্যে এমন কিছু প্রবর্তন করতে চায় যা এ দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং যে পরিবর্তন থেকে আল্লাহ তাঁর দীনকে ১৪শত বছর পূর্বেই মুক্ত ঘোষণা করেছেন।

প্রিয় পাঠক! সাবধান! এ ধরনের মিথ্যা অপবাদ বিশ্বাস করবেন না এবং নিজদের মধ্যে এর প্রচার হতেও দিবেন না। সত্য স্পষ্ট, সত্যের অন্বেষণকারী সাধারণত ধোকায় পতিত হয় না। অতএব, সত্যকে প্রমাণ ভিত্তিক অন্বেষণ করুন এবং যে ব্যাপারে জটিলতার সৃষ্টি হয়, সে ব্যাপারে প্রকৃত আলেমদের নিকট জিজ্ঞাসা করে জেনে নিন। মিথ্যুকদের মিথ্যা শপথের কারণে ধোকায় পতিত হবেন না। মনে রাখবেন, অভিশপ্ত ইবলিশ আপনাদের পিতা-মাতাকে (আদম-হাওয়া) শপথ করে বলেছিল, আমি তোমাদের জন্য হিতাকাংক্ষী অথচ সে ছিল সবচেয়ে বড় মিথ্যুক। আল্লাহ সে সম্পর্কে সূরা আরাফে বর্ণনা করেন: “আর সে তাদের নিকট শপথ করল যে, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের উভয়ের জন্য কল্যাণকামীদের একজন”। (আরাফ:২১)
অতএব, শয়তান থেকে ও তার অনুসারী মিথ্যুকদের থেকে সতর্ক হোন। মনে রাখবেন, তারা নিরীহ মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য মিথ্যা শপথ, মিথ্যা অঙ্গীকার ও অনেক মুখরোচক বাণীর আশ্রয় নিয়ে থাকে।

আল্লাহ আমাদেরকে ও সমস্ত মুসলমানকে শয়তানের অনিষ্ট, বিপথগামীদের ফিতনা, কুচক্রীদের কুচক্র ও বাতিল পন্থীদের ধোকা থেকে রক্ষা করুন। যারা চায় আল্লাহর নূর তাদের মুখের ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে এবং লোকদের মধ্যে দীনের ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করতে, তারা জেনে রাখুক, আল্লাহ তাঁর নূরের পূর্ণতা দান করবেন এবং তাঁর দীনকে সাহায্য করবেন, যদিও তা আল্লাহর দুশমন শয়তান বা তার অনুসারী নাস্তিক-মুরদাতদের অপছন্দ হয়।
আমরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি যেন, মুসলমানদের সংশোধন করে দেন, তাদেরকে সত্যের অনুসরণ করা, তার ওপর সূদৃঢ় থাকা ও সকল অন্যায় থেকে তওবা করার তওফিক দান করেন।
তিনি তওবা কবুলকারী দয়ালু এবং প্রত্যেক বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান।

বইঃ বিদয়াত থেকে সাবধান!
লেখকঃ শায়খ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বাজ
অনুবাদক : মুহাম্মদ আব্দুর রব আফ্ফান
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদক : সানাউল্লাহ নজির আহমদ
ইসলাম হাউস

Advertisements
This entry was posted in বিদ'আত. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s