কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান
সম্পাদনা : ইকবাল হোছাইন মাছুম

নেক আমল, কল্যাণকর কাজ ও সৎকর্মে অগ্রগামী হওয়া, প্রতিযোগিতা করা মহান আল্লাহর একটি নির্দেশ। ইসলামী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,‘সুতরাং তোমরা কল্যাণকর্মে প্রতিযোগিতা কর।’ (সূরা বাকারা : ১৪৮)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:‘আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৩৩)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:”তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করছ না? অথচ আসমানসমূহ ও পৃথিবীর উত্তরাধিকারতো আল্লাহরই? তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে তারা সমান নয়। তারা মর্যাদায় তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যারা পরে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত”। (সূরা হাদীদ:১০)

উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে আমরা যা শিখতে পারি :
১- প্রথম আয়াতে আল্লাহ তাআলা ভাল কাজে প্রতিযোগিতা করতে আদেশ করেছেন। তিনি এখানে ‘খাইরাত’ শব্দটি বহুবচন ব্যবহার করে সকল প্রকার ভাল কাজকে বুঝিয়েছেন। সকল ভাল কাজেই প্রতিযোগিতার নির্দেশ দিয়েছেন।
২- দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর ক্ষমা লাভের যে সকল বিষয় আছে সে সকল বিষয় ও পন্থা-পদ্ধতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার জন্য আদেশ করেছেন। এমনিভাবে জান্নাত লাভের জন্য অগ্রসর হতে আদেশ করেছেন।
৩- তিনি জান্নাতের পরিধি সম্পর্কে বলেছেন এটা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমান।
৪- এ জান্নাত প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। যারা সকল কাজ-কর্মে, চিন্তা-ভাবনায় আল্লাহ-কে ভয় করে, তাঁর নির্দেশনা মান্য করে জীবন পরিচালনা করে।
৫- সূরা আল হাদীদের দশ নং আয়াত থেকে আমরা জানতে পারলাম, যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে আল্লাহর পথে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে, আর যারা মক্কা বিজয়ের পরে তা করেছে তারা মর্যাদার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার কাছে সমান নয়। কারণ, তারা ভাল কাজের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে গেছে।

হাদীস -১.

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা সৎকাজে দ্রুত অগ্রসর হও। শীঘ্রই অন্ধকার রাতের মত ফেতনা দেখা দিবে। তখন অবস্থা এমন হবে যে, সকাল বেলা একজন মানুষ মুমিন থাকবে আর সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে। আবার সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে সকালে কাফের হয়ে যাবে। তারা পার্থিব সামান্য স্বার্থে নিজের ধর্ম বিক্রি করে দিবে।’ (বর্ণনায়, সহিহ মুসলিম)


হাদীস থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :
১- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৎকাজে দ্রুত অগ্রসর হতে বলেছেন। সৎকাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হলে বিলম্ব করা উচিৎ নয় কোনোভাবেই।
২- সময় থাকতে সময়ের মর্যাদা দেয়া ও সুযোগ থাকতে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ ফেতনা শুরু হয়ে গেলে ভাল কাজের আর সুযোগ থাকে না। তাই সময় ও সুযোগ থাকতে তা ভালকাজে ব্যবহার করা উচিত।
৩- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসে ফেতনার একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। অন্ধকার রাতের মত ফেতনা এতটা ঘণীভূত হবে যে, একজন মানুষ সকালে মুসলিম থাকলে তার পক্ষে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইসলাম নিয়ে বেঁচে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়বে।
৪- ইসলাম বিরোধী প্রচারণা ও তৎপরতা এত বেড়ে যাবে যে, একজন মানুষ সন্ধ্যায় মুসলিম হয়েও সকালে ইসলাম সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে যাবে।
৫- মানুষ সামান্য অর্থ-বিত্ত, চাকুরী, ভিসা, পদ, প্রচারনা, রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার লোভে ইসলামকে বিকিয়ে দিবে। অমুসলিম শক্তির সাথে দহরম-মহরম শুরু করবে। ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলতে আরম্ভ করবে।
৬- মানুষ এতটা বস্তু ও ভোগবাদী হয়ে যাবে যে, মুসলিম হয়েও সামান্য কিছুর বিনিময়ে ইসলামের অনুশাসন ত্যাগ করবে।
৭- ‘সকালে মুসিলম আর বিকালে কাফের’ এ কথার অর্থ এটাও যে, মানুষ মুসলিম পরিবারে জন্ম নেবে, মুসলিম নাম ধারণ করবে, মুসলিম দেশে বসবাস করবে, মুসলিম হওয়ার সামাজিক সুবিধা ভোগ করবে কিন্তু নিজেকে মুসলিম হিসাবে পরিচয় দিতে কুন্ঠিত হবে। ইসলামকে গুরুত্বহীন ভাবতে থাকবে।
৮- একজন মানুষ যেমন কোনো কিছুর বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করে দিতে পারে না। তেমনি কোনো কিছুর বিনিময়ে কখনো নিজের ধর্ম ইসলামকেও বিক্রি করে দিতে পারে না। ইসলাম বিক্রি করে দেয়ার মানে হল, কিছু একটা পাওয়ার জন্য ইসলামের কোনো কিছুকে ত্যাগ করা। লোভে বা ভয়ে ইসলামের কোনো অনুশাসন ত্যাগ করা কিংবা ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থ বিরোধী কাজ করা। এ কথা সকলেরই জানা যে, কেউ বলে না আমি ইসলাম বিক্রি করে দেব। তারপরও সে এ সকল পদ্ধতিতে ইসলাম বিক্রি করে দেয়।

হাদীস -২.

আবু সিরওয়া উকবা ইবনে হারিস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদীনায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিছনে আসরের নামাজ আদায় করলাম। তিনি সালাম ফিরালেন। অতপর অতি দ্রুত উঠে মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে তাঁর স্ত্রীদের কোনো একজনের ঘরের দিকে গেলেন। উপস্থিত লোকেরা তাঁর এ দ্রুততা দেখে ভীত ও শংকিত হয়ে গেল। এরপর তিনি আবার তাদের কাছে বের হয়ে আসলেন। তিনি দেখতে পেলেন, লোকেরা তার দ্রুততার কারণে আশ্চর্য বোধ করছে। তখন তিনি বললেন, ‘আমার এক টুকরা সোনার কথা মনে পড়ে গিয়েছে, ওটা আমার কাছে আটকে থাকবে আমি তা পছন্দ করি না। তাই সেটা বন্টন করে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে আসলাম।’
বর্ণনায়: সহিহ বুখারী


হাদীস থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :
১- নামাজের সালাম ফিরিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করেননি।
২- জরুরী কাজ থাকলে সালাম ফিরোনোর সাথে সাথে মসজিদ থেকে বের হওয়া যায়।
৩- নেককাজ দ্রুত সম্পাদনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুবই যত্নবান ছিলেন। নামাজের পর মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে তিনি সেটা সমাধা করার জন্য ছুটে গেলেন। অথচ তিনি মানুষের ঘাড় ডিঙ্গানো পছন্দ করতেন না।
৪- সৎকাজের ইচ্ছা ও সুযোগ আসার সাথে সাথে তা সম্পাদন করে ফেলা উচিত। কারণ, পরে ভুলে যাওয়া হতে পারে, সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে, কোনো দিক থেকে বাধা আসতে পারে কিংবা শয়তানের প্ররোচনার শিকার হতে পারে।
৫- ফরজ নামাজের পর মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে দরস প্রদান বা শিক্ষা মূলক আলোচনা করার বিষয়টি প্রমাণিত হল। এ হাদীসে আমরা দেখলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে ফিরে এসে দরস প্রদান করলেন।
৬- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মত রক্ত মাংসের মানুষ ছিলেন বলেই তিনি বন্টনের বিষয়টি ভুলে গিয়েছিলেন।
৭- আমানত সংরক্ষণ ও তা প্রকৃত অধিকারীদের মধ্যে পৌঁছ দেয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক যত্নবান ছিলেন।

হাদীস -৩.

জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, উহুদ যুদ্ধের দিন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলল, আমি যদি নিহত হই, তাহলে আমি কোথায় থাকব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘জান্নাতে।’ তখন সে তার হাতের খেজুরগুলো নিক্ষেপ করল। অতপর লড়াই শুরু করে দিল। শেষ পর্যন্ত সে নিহত হয়ে গেল। বর্ণনায়: বুখারী ও মুসলিম


হাদীস থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :
১- ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ, লড়াই ও সংগ্রাম করার ফজিলত প্রমাণিত হল এ হাদীসে।
২- জিহাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পূণ্যময় কাজ। এর মর্যাদা এত বেশী যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিহাদকে ইসলামের শীর্ষ চূড়া বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাইতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত সাহাবীকে জিহাদে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, তুমি নিহত হলে জান্নাতই হবে তোমার চিরন্তন ঠিকানা।
৩- সাহাবী জিহাদের এই পূণ্যময় কাজটি সম্পাদন করার জন্য এত উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলেন যে, হাতে রেখে খেতে থাকা খেজুরগুলো শেষ করলেন না, ফেলে দিলেন। জিহাদে অংশ নিতে দেরী হয়ে যাবে এই সামান্য দেরীটুকু বরদাশত করতে রাজী ছিলেন না। এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম ভাল কাজ করতে সামান্য দেরীও করতেন না। সংশয়-সন্দেহে পতিত হতেন না।
৪- আল্লাহর দীন ইসলাম-কে সবের্াচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লড়াই সংগ্রাম করার নাম জিহাদ। জিহাদের নিয়ত হতে হবে আল্লাহর দীনকে বুলন্দ করা। তেমনি শহীদ হয়ে জান্নাত লাভ করার নিয়তও করতে হবে। যেমনটি করেছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই সাহাবী।
৫- ইলম বা জ্ঞান অর্জনের জন্য সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। সুযোগ পেলেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে প্রশ্ন করে অজানা বিষয়টি জেনে নিতেন।
৬- ইলম অনুযায়ী আমল করার বিষয়টি খুবই প্রত্যক্ষভাবে ফুটে উঠেছে এ হাদীসে। আলোচিত সাহাবী যখনই ইলম অর্জন করলেন যে, জিহাদে নিহত হলে আমার স্থান হবে জান্নাতে, তখনই তিনি তা সম্পন্ন করে নিলেন। অর্জিত ইলম-কে নিজ জীবনে বাস্তবায়িত করলেন।

হাদীস -৪.
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, কোন ধরনের দান-সদকায় বেশী সওয়াব লাভ করা যায় ? তিনি বললেন, তোমার এমন অবস্থায় সদকা করা যে তুমি সুস্থ, সম্পদের প্রতি চাহিদা আছে, দরিদ্রতার ভয় করছ ও সচ্ছলতার আশা করছ। আর এমনভাবে বিলম্ব করবে না যে, যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যাবে তখন বলবে এটা অমুকের জন্য, ওটা অমুকের জন্য। অথচ তা অমুকের জন্য নির্ধারিত হয়েই আছে।’
বর্ণনায়: বুখারী ও মুসলিম


হাদীস থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :
১- কোন অবস্থায় সদকা করলে বেশী সওয়াব, হাদীসে সে প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়েছে। সদকাকারী যখন সুস্থ থাকবে, সম্পদের প্রতি চাহিদাও রয়েছে, সদকা করলে দরিদ্রতার ভয়ও আছে, এমন অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দান-সদকা হল উত্তম দান-সদকা। অতএব যে ব্যক্তি খুব ধনী, যার দরিদ্রতার ভয় নেই কিংবা মৃত্যমুখে পতিত সে ব্যক্তির সদকা এমন মর্যাদার অধিকারী নয়।
২- সময় ও হায়াত থাকতে সদকা করা উচিত। এমনিভাবে সকল প্রকার সৎকাজ তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করা উচিত। মৃত্যুর আগে আগে সব ভাল কাজ করে, তওবা করে পাক-পবিত্র হয়ে যাবো এমন আশা করে থাকা ঠিক নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

‘আর আমি তোমাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় কর, তোমাদের কারো মৃতু্য আসার পূর্বে। কেননা তখন সে বলবে, হে আমার রব, যদি আপনি আমাকে আরো কিছু কাল পর্যন্ত অবকাশ দিতেন, তাহলে আমি দান_সদকা করতাম। আর সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’
(সূরা মুনাফিকুন: ১০)
৩- মৃত্যুকালে দান করলে সেটা দান হয় না। সেটা হয় অসিয়ত। যা পুরো সম্পদে কার্যকর হয় না কার্যকর হয় কেবলমাত্র তিন ভাগের একভাগ সম্পদে তাও আবার শর্ত স্বাপেক্ষে। এর প্রতি ইঙ্গিত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ সে বলে এটা অমুককে দান করলাম ওটা অমুকের জন্য দান করলাম অথচ তা অমুকের জন্য নির্ধারিত হয়েই আছে।’
৩- দান-সদকাসহ যে কোনো নেক কাজ ও সৎকর্মে অলসতা পরিহার করতে হবে।

হাদীস -৫.

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদ যুদ্ধের দিন একটি তরবারি হাতে নিয়ে বললেন, ‘কে আমার কাছ থেকে এ তরবারিটি গ্রহণ করবে।’ তখন সকলেই আমি আমি বলে হাত বাড়াল তা গ্রহণ করার জন্য। এরপর তিনি বললেন, ‘কে এর হক যথাযথভাবে আদায় করার জন্য গ্রহণ করবে?’ এ কথা শুনে সব লোক থেমে গেল। আর আবু দুজানা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমি এর হক আদায় করার জন্য গ্রহণ করব।’ অতপর তিনি সেটা গ্রহণ করলেন ও মুশরিকদের শিরোচ্ছেদ করলেন। বর্ণনায়: সহিহ মুসলিম


শিক্ষা ও মাসায়েল :
১- জিহাদ করার প্রতি সাহাবায়ে কেরামের আগ্রহ থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। তাদের সকলেই একটি সৎকাজ সম্পাদনের জন্য তরবারি গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কেউ দেরী করেননি। কেউ বিরত থাকেননি।
২- সাহাবী আবু দুজানার ফজিলত প্রমাণিত হয়েছে। যখন সকলে চুপ হয়ে গেলেন তখন তিনি সাহসিকতার প্রমাণ দিলেন। আবু দুজানা তার উপনাম। আসল নাম হল ছিমাক ইবনে খারছাহ।

হাদীস -৬.

আবু যুবায়ের ইবনে আদী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আসলাম। এসে তখনকার শাসক হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের পক্ষ থেকে যে সকল নির্যাতন ভোগ করছিলাম সে সম্পর্কে নালিশ জানালাম। তিনি বললেন, ‘তোমরা ধৈর্য ধারণ করো। কারণ যে যুগই আসে তার পরবর্তী যুগ এরচেয়ে খারাপ হয়ে থাকে। এ অবস্থা চলবে তোমাদের প্রভুর সাথে তোমাদের সাক্ষাত হওয়া পর্যন্ত। আমি এ কথা তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি।’
বর্ণনায়: সহিহ বুখারী


হাদীস থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :
১- বিপদ মুসীবতে বা কারো দ্বারা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হলে বড়দের কাছে অভিযোগ করা দোষের কিছু নয়। যেমন এ হাদীসে আমরা দেখলাম সাহাবী আনাসের কাছে অনেকে অভিযোগ করতে এসেছেন।
২- আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিয়েছেন। ধৈর্য ধারণ একটি সৎকাজ। তিনি এ কাজে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। অন্যকে ধৈর্যের প্রতি উৎসাহ দেয়া এমন একটি গুণ যার প্রশংসা আল্লাহ তাআলা করেছেন। যেমন সূরা আল আসরে তিনি বলেছেন,

‘তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।‘ (সূরা আসর:৩)
আবার সূরা আল বালাদে বলেছেন,

অতঃপর সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যারা ঈমান এনেছে এবং পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্যধারণের, আর উপদেশ দেয় দয়া_অনুগ্রহের।’ (সূরা আল বালাদ, আয়াত ১০)
৩- শাসক শ্রেণীর নির্যাতন নিপীড়নের মুখে ধৈর্য অবলম্বন করার নির্দেশ এসেছে বহু হাদীসে। কোনো অবস্থাতে তাদের জুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বা অস্ত্র ধারণ করা জায়েয হবে না।


হাদীস -৭.

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা সাত বিষয় আসার পূর্বেই কাজ সম্পাদন করে ফেল। তোমরা তো কেবল অপেক্ষা করছ এমন দারিদ্রের যা আল্লাহকে ভুলিয়ে দেয় ? অথবা এমন ধন-সম্পদের যা আল্লাহর বিরোধিতার দিকে নিয়ে যায় ? অথবা এমন অসুস্থতার যা শরীরকে শেষ করে দেয় ? অথবা এমন বার্ধ্যক্যের যা বিবেক-বুদ্ধিকে শেষ করে দেয়? অথবা দাফন কাফন সম্পন্ন মৃত্যুর? অথবা দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ করার, খুবই নিকৃষ্ট অদৃশ্য যার অপেক্ষা করা হচ্ছে? অথবা কয়ামতের? আর কেয়ামততো ভীষণ ভয়ানক ও তিক্ত।’
বর্ণনায়: তিরমিজী, তিনি বলেছেন, হাদীসটি হাসান।
বিশেষ জ্ঞাতব্য : প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আলবানী রহ. হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন। এর দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য সম-অর্থের অন্য কোনো হাদীসও নেই। সিলসিলাতুল আহাদীস আদ দায়ীফা গ্রন্থের ১৬৬৬ নম্বর হাদীস দ্রষ্টব্য।

হাদীস -৮.

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, খায়বর অভিযানের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এ পতাকা এমন একজনকে প্রদান করব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে। আল্লাহ তাআলা তার হাতে বিজয় দান করবেন।’ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি একমাত্র এদিনই নেতৃত্ব কামনা করেছি, এছাড়া আর কোনো দিন আমি নেতৃত্ব পছন্দ করিনি। আমি মাথা উচু করে দাড়ালাম যেন আমাকে ডাকা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে পতাকা দিয়ে বললেন, ‘চলতে থাকো, এদিক সেদিক তাকাবে না। যতক্ষণ না আল্লাহ তোমার হাতে বিজয় দান করেন।’ আলী একটু চললেন, তারপর দাড়ালেন, কিন্তু কোনো দিক তাকালেন না। তিনি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিসের উপর লোকদের সাথে লড়াই করব। তিনি বললেন, ‘তাদের সাথে লড়াই করবে যতক্ষণ না তারা এ কথার স্বাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। তারা যখন এ স্বাক্ষ্য দেবে তখন তোমার হাত থেকে তাদের প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করতে পারবে। তবে তাদের সম্পদের ইসলামের হক তাদের থেকে আদায় করা হবে ও তার হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে।’
বর্ণনায়: সহিহ মুসলিম


হাদীস থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :
১- যুদ্ধের ময়দানে পতাকা বহন করা একটি সুন্নত। যিনি অভিযান পরিচালনা করেন মূলত তার কাছেই পতাকা থাকত।
২- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন পতাকা প্রদানের কথা বললেন তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তা পাওয়ার আশা করলেন। এ দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম যে, সাহাবায়ে কেরাম নেককাজ করার ক্ষেত্রে সর্বদা অগ্রগামী ও উৎসাহী ছিলেন। শিরোনামের সাথে এ হাদীসটির সম্পর্ক এখানেই।
৩- নেতৃত্ব গ্রহণের লোভ করা ঠিক নয়। যেমন আমরা এ হাদীসে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্য দ্বারা বুঝতে পারলাম। এ ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে কতর্ৃত্ব করার লোভ ও নেতৃত্বের প্রার্থী হতে নিষেধ করেছেন।
৪- নিজের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে কোনো বিষয় বুঝে না আসলে তা জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হয়। যেমন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, আমি কিসের উপর তাদের সাথে লড়াই করব।
৫- আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফজিলত প্রমাণিত হল এ হাদীসে।
৬- তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ করার নির্দেশ দিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এ হাদীস দ্বারা তাওহীদের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।
৭- সাহাবায়ে কেরাম কত যত্নের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পালন করেছেন তার একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত এ হাদীস। তিনি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এদিক ওদিক তাকাতে নিষেধ করেছেন। এ নির্দেশ এমনভাবে পালন করেছেন যে, প্রশ্ন করার সময় প্রয়োজন হওয়া সত্ত্বেও অন্য দিকে তাকাননি। বরং চিৎকার করে প্রশ্ন করেছেন, যেন এর জন্য কোনো দিকে তাকাতে না হয়।
৮- কেউ তাওহীদ ও রিসালাতের স্বাক্ষ্য প্রদান করলে তার জান ও মাল হেফাজত করার দায়িত্ব সকল মুসলমানের। কোনো মুসলমানের পক্ষ থেকে তার প্রাণ ও সম্পদের প্রতি কোনো হুমকি আসতে পারে না।
৮- ইসলামের কোনো হক বা অধিকার ব্যতীত তার সম্পদের কোনো কিছু গ্রহণ করা যাবে না।
৯- আর সে যদি প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দিয়ে মনে মনে কুফর-শিরক লালন করে, তবে তার হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে থাকবে। মানুষের কাজ নয় তার ইসলাম গ্রহণ নিয়ে সন্দেহ করা, তার মুসলমানিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা তার ইসলাম সঠিক নয় বলে প্রত্যাখ্যান করা।

বি; দ্র: হাদীসগুলো ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ সংকলিত রিয়াদুস সালেহীন গ্রন্থ থেকে সংগৃহিত।

সমাপ্ত

Advertisements
This entry was posted in ইসলাম ও মুসলিম. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s