দরিদ্র জীবনযাপন, সংসারে অনাসক্তি,পার্থিব বস্তু কম অর্জনের উৎসাহ প্রদান এবং দারিদ্রতার ফযীলত-২

রিয়াদুস সালেহীন
২য় খণ্ড

৪৬৩ হযরত মুস্তাওরিদ ইবন শাদ্দাদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ পরকালের তুলনায় ইহকালের দৃষ্টান্ত হলো এরুপ যে, তোমাদের কেউ তার কোনো একটি আঙ্গুল সমুদ্রে ডুবিয়ে রেখে যতটুকু সাথে নিয়ে ফিরে। (আঙ্গুলের অগ্রভাগে সমুদ্রের পানির যে অংশ লেগে থাকে, সমুদ্রের তুলনায় এটা যেরুপ কিছুই নয়, তেমনি আখিরাতের তুলনায় দুনিয়াটা কিছুই নয়)। [মুসলিম]

৪৬৪ হযরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো একটি বাজারের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন, আর তাঁর দুপাশে ছিলেন সাহাবায়ে কিরাম(রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। তিনি যখন একটি কানকাটা মরা ছাগল ছানার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি এর কান ধরে তাঁদের জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের কেউ কি এক দিরহামের বিনিময়ে এটা কিনতে রাজি আছো? তাঁরা বললেন, আমরা কোনো কিছুর বিনিময়ে এটা কিনতে রাযি রাজি নয়; আর আমরা এটা দিয়ে করবই বা কি ?

তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা বিনামূল্যে এটা নিতে রাজি আছো?
তাঁরা বললেন, আল্লাহর কসম ! এটা যদি জীবিতও থাকতো, তবু তো এটা ত্রুটিপূর্ণ; কেননা এটার কানকাটা। তবে মৃতটাকে দিয়ে কি হবে?

অতঃপর তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম করে বলছি ! তোমাদের কাছে এ ছাগল ছানাটা যেরুপ নিকৃষ্ট দুনিয়াটা আল্লাহর কাছে এর চাইতেও বেশি নিকৃষ্ট। (মুসলিম)


৪৬৫ হযরত আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মদীনায় কালো কংকরময় প্রান্তরে হাঁটছিলাম। অতঃপর ওহুদ পাহাড় আমাদের দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বললেনঃ হে আবু যার ! আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ !আমি আপনার খেদমতে হাজির আছি।

তিনি বললেনঃ এই ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও যদি আমার কাছে থেকে থাকে, তবু আমি খুশি হবো না। কেননা, তিন দিনও অতীত হবে না যে, আমার কাছে তা থেকে ঋণ আদায়ের অংশ ছাড়া এক দীনারও অবশিষ্ট থাকবে না; বরং আমি আল্লাহর বান্দাদের মাঝে এভাবে ওভাবে, ডানে-বাঁয়ে, এবং পেছনে খরচ করে ফেলবো। একথা বলে তিনি এগিয়ে চললেন এবং বললেনঃ বেশি সম্পদশালীরাই কিয়ামতের দিন নিঃস্ব হবে; কিন্তু যারা সম্পদ এভাবে ডানে-বাঁয়ে ও পেছনে খরচ করেছে তারা নিঃস্ব হবে না। তবে এ ধরণের লোকের সংখ্যা খুবই কম।

অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত নিজের স্থান থেকে নড়ো না। অতঃপর তিনি রাতের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আমি একটা বিকট শব্দ শুনে ভয় পেয়ে গেলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কোনো অস্বাভাবিক কিছু ঘটে গেলো কি না?
কাজেই আমি তাঁর কাছে যাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু তাঁর এ আদেশ; “আমি না আসা পর্যন্ত নিজের স্থান থেকে নড়ো না” স্মরণ হয়ে গেলো এবং তাঁর ফিরে আসার পূর্ব পর্যন্ত আমি স্থান ত্যাগ করলাম না।
তিনি ফিরে এলেন। অতঃপর আমি তাঁকে বললাম, আমি তো একটা বিকট শব্দ শুনে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আপনার আদেশ স্মরণ হওয়াতে এখানেই দাঁড়িয়ে আছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন; তুমি তাহলে সে শব্দ শুনেছো? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এটা জিবরাঈলের শব্দ। তিনি আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি বলে গেলেন; তোমার উম্মতের যে কেউ আল্লাহর সাথে কিছুকে শরীক না করে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, সে যদি চুরি করে? তিনি বললেনঃ সে যদি যিনাও করে এবং চুরিও করে, তবু জান্নাতে যাবে। (বুখারি ও মুসলিম)

৪৬৬ হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ আমার কাছে যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে, তাহলে তিন দিন যেতে না যেতে আমার কাছে এর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, আমি এতেই আনন্দিত হবো। তবে ঋণ আদায়ের জন্যে কিছু অংশ আটকে রাখতে পারি। (বুখারি, মুসলিম)

৪৬৭ হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের চাইতে নিম্ন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির দিকে তাকাও এবং তোমাদের চাইতে উচ্চ মর্যাদাশীলদের দিকে তাকিও না। তোমাদের উপর আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহকে নিকৃষ্ট মনে না করার জন্যে এটাই উৎকৃষ্ট পন্থা। (বুখারি ও মুসলিম) বুখারীর অপর এক বর্ণনায় আছে, “তোমাদের কেউ যখন তার চাইতে ধনী ও সৌন্দর্যমণ্ডিত কোনো ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে দেখো, তখন সে যেনো তার চাইতে নিম্নমানের ব্যক্তির দিকেও তাকায়।

৪৬৮ হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন; দীনার, দিরহাম, কালো চাদর ও চওড়া পেড়ে পশমী চাদরের অনুরাগী গোলাম ধ্বংস হয়েছে। কেননা, তাকে যদি দেওয়া হয়, তবে খুশী আর না দেয়া হলেই অখুশী। (বুখারি)

৪৬৯ হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সত্তরজন আসহাবে সুফফাকে দেখেছি তাঁদের কারো কারো চাদর ছিল না। কারো হয়তো একটি লুঙ্গি আর কারো একটি কম্বল ছিল। তারা এটাকে নিজেদের গলায় বেঁধে রাখতেন। কারোরটা হয়ত তাঁর পায়ের গোছার অংশ পর্যন্ত পৌঁছত; আর কারোরটা হাঁটু পর্যন্ত। লজ্জাস্থান দেখা যাওয়ার ভয়ে তারা হাত দিয়ে এটাকে ধরে রাখতেন। (বুখারী)

৪৭০। হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “দুনিয়াটা হলো ঈমানদারদের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্যে জান্নাত বা উদ্যান”। (মুসলিম)

৪৭১ হযরত ইবন উমার(রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কাঁধ ধরে বললেনঃ দুনিয়াতে তুমি মুসাফির অথবা পথচারী হয়ে থেকো। আর এ জন্যেই ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলতেনঃ তুমি যখন সন্ধ্যা যাপন করো তখন সকালের প্রতীক্ষা করো না। আর যখন তুমি ভোর পাও তখন সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। আর তোমার সুস্থ সুময়ে রোগের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো এবং তোমার জীবনকালে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করো। (বুখারী)

৪৭২ হযরত আবুল আব্বাস সাহল ইবন সা’দ সাঈদী(রা) থেকে বর্ণিত। তিন বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললো, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! আমাকে এমন কোনো আমলের কথা বলে দিন, যখন আমি তা করবো, তখন আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন এবং মানুষও আমাকে ভালোবাসবে। উত্তরে তিনি বললেন, দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত হও, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন; আর মানুষের কাছে যা কিছু আছে, সেদিকে লোভ করো না, মানুষও তোমাকে ভালোবাসবে। হাদীসটি হাসান, ইবন মাজাহ এটি বর্ণনা করেছেন।

৪৭৩ হযরত নু’মান ইবন বাশীর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে সব লোকের পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ ও ধন-সম্পদ অর্জিত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি, সারাদিন তাঁর (নাড়িভূড়ি) পেঁচিয়ে থাকতো, অথচ ঐ পেটে দেয়ার জন্যে এমন কোনো নষ্ট পুরোনো খেজুরও মিলতো না। (মুসলিম)

Advertisements
This entry was posted in অনুপ্রেরণাদায়ী ঘটনা, হাদীস. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s