দরিদ্র জীবনযাপন, সংসারে অনাসক্তি,পার্থিব বস্তু কম অর্জনের উৎসাহ প্রদান এবং দারিদ্রতার ফযীলত-১

[রিয়াদুস সালেহীন , ২য় খণ্ড]

মহান আল্লাহর বাণীঃ ‘বস্তুত পার্থিব জীবনের অবস্থা তো এরূপ, যেরূপ আমি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করলাম, অতঃপর এর সাহায্যে যমীনের সে সব উদ্ভিদ অত্যন্ত ঘন হয়ে উৎপন্ন হলো, যেগুলো মানুষ এবং পশুরা ভক্ষণ করে। অতঃপর যমীন যখন পরিপূর্ণ সুদৃশ্য রূপ পরিগ্রহ করলো এবং শোভনীয় হয়ে উঠলো, আর এর মালিকেরা মনে করতে লাগলো যে, তারা এর পূর্ণ অধিকারী হয়ে গেছে, তখনি দিনে অথবা রাতে আমার পক্ষ থেকে কোন আযাব এসে পড়লো, আর আমি এগুলোকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিলাম, যেনো গতকাল এগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনসমূহ আমি এরূপেই বিশদভাবে বর্ণনা করে থাকি’। (সূরা ইউনুসঃ২৪)

“আর আপনি তাদের কাছে পার্থিব জীবনের অবস্থা বর্ণনা করুন। তা হচ্ছে ঠিক এমনি যেমন আমি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করলাম। অতঃপর এর সাহায্যে যমীনের উদ্ভিদসমূহ ঘন হয়ে উৎপন্ন হলো এবং পরে তা শুকিয়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলো এবং বাতাস এগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে ফিরতে লাগলো। আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর উপর পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি পার্থিব জীবনের একটি শোভামাত্র। অনেক কাজসমূহ অনন্তকাল ধরে থাকবে; আর এগুলোই আপনার রবের কাছে সাওয়াব হিসেবে এবং আশা আকাংক্ষার প্রতীক হিসেবে উত্তম”। (সূরা কাহফঃ ৪৫-৪৬)

“জেনে রেখো, পার্থিব জীবন তো কেবল খেল-তামাশা এবং জাঁকজমক ও পরস্পর আত্মগর্ব করা, আর ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি সম্বন্ধে একে অন্যের অপেক্ষা প্রাচুর্য বর্ণণা করা মাত্র। যেরূপ বৃষ্টি বর্ষিত হলে এর সাহায্যে উৎপাদিত ফসল কৃষকদের আনন্দ দেয়, অতঃপর তা শুকিয়ে যায় এবং তুমি তাকে হরিদ্রা বর্ণের দেখতে পাও। অতঃপর তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। আর পরকালে রয়েছে কঠোর শাস্তি; আর আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর পার্থিব জীবন হলো প্রতারণার উপকরণ মাত্র”। (সূরা হাদীদঃ ১০)

“নারী, সন্তান-সন্ততি , পুঞ্জিভূত সোনা-রূপা, চিহ্নিত ঘোড়া, পালিত পশু ও শস্যক্ষেত, এগুলোর প্রতি আকর্ষণ ও ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মনকে সুশোভিত করা হয়েছে। মূলত এগুলো হলো পার্থিব জীবনের ব্যবহারিক উপকরণ। আল্লাহর নিকট রয়েছে সুশোভিত পরিণাম বা প্রত্যাবর্তন”। (সূরা আলে ইমরানঃ ১৪)

“হে মানব জাতি! আল্লাহর ওয়াদা অবশ্যই সত্য; সুতরাং এ পার্থিব জীবন যেনো তোমাদের ধোঁকায় ফেলে না রাখে। আর মহা প্রতারক (শয়তান) যেনো তোমাদের আল্লাহ স্বম্বন্ধে ধোঁকায় ফেলতে না পারে”। (সূরা ফাতিরঃ ৫)

“ঐশ্বর্য, প্রাচুর্য ও দাম্ভিকতা তোমাদের ভুলিয়ে রেখেছে। এভাবেই তোমরা কবরে পৌঁছে যাও। কখনো নয়, অতি শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। অতঃপর কখনো নয়, তোমরা অবিলম্বেই জানতে পারবে। কখনো নয়, যদি তোমরা নিশ্চিতরূপে জানতে পারতে”। (সূরা তাকাসুরঃ ১-৫)

“আর এই পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়, বস্তুত পরকালের জীবনই প্রকৃত জীবন। যদি তারা তা জানতে পারতো”। (সূরা আল আনকাবূতঃ ৬৪)

৪৫৭। হযরত আমর ইবন আউফ আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাহরাইনে যিযিয়া আদায় করে আনার জন্য আবু উবায়দা ইবন জাররাহকে পাঠিয়েছিলেন। অতঃপর বাহরাইন থেকে ধন-সম্পদ নিয়ে মদীনায় ফিরে এলেন। আনসারগণ যখন শুনতে পেলেন যে, হযরত আবু ওবায়দা(রা) ফিরে এসেছেন,তখন তাঁরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ফযরের নামায পড়ার জন্যে এসে পৌঁছলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায শেষ করার পর তাঁরা তাঁর সামনে উপস্থিত হলেন। তাঁদের দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকি হেসে বললেন; আমার মনে হচ্ছে, তোমরা আবু ওবায়দার বাহরাইন থেকে মাল নিয়ে আসার সংবাদ শুনতে পেয়েছো? তারা বললেন; হ্যাঁ, ইয়া রাসুলুল্লাহ। অতঃপর তিনি বললেন; তোমরা আনন্দিত হও, আর যে বস্তু তোমাদের খুশীর কারণ তার আশা পোষণ করো। তবে আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি তোমাদের দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয় করছি না বরং ভয় করছি এ জন্যে যে, পার্থিব(সামগ্রী) তোমাদের সামনে প্রসারিত হয়ে যাবে, যেরূপে তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য প্রসারিত হয়েছিল। আর তারা যেরূপে লালসা ও মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল, তোমরাও সেরূপ লালসাগ্রস্ত হয়ে পড়বে এবং (এই পার্থিব সামগ্রী) তাদের যেরূপে ধ্বংস করেছে, তোমাদেরও সেরূপ ধ্বংস করবে। (বুখারি ও মুসলিম)

৪৫৮। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বরে বসলেন এবং আমরাও তাঁর চারপাশে বসলাম। অতঃপর তিনি বললেন; আমার তিরোধানের পর যে বিষয়গুলো সম্বন্ধে তোমাদের জন্যে আমার ভয় হচ্ছে তার মধ্যে একটা হলো, বিভিন্ন দেশ জয়ের পর তোমাদের হাতে যখন প্রাচূর্য আসবে। (বুখারি ও মুসলিম)

৪৫৯। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘দুনিয়াটা একটা শ্যামল সবুজ সুমিষ্ট বস্তু। মহান আল্লাহ এখানে তোমাদের প্রতিনিধি বানিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তোমরা কি করছো তা দেখছেন। সুতরাং এ দুনিয়ার (লোভ-লালসা) থেকে আত্মরক্ষা করো এবং স্ত্রীলোকের (ফিতনা) সম্পর্কেও সতর্ক থাকো। (মুসলিম)

৪৬০। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন; “হে আল্লাহ! পরকালের জীবনই তো প্রকৃত জীবন”। (বুখারি ও মুসলিম)

৪৬১। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন; তিনটি জিনিস মৃতের পেছনে পেছনে (কবর পর্যন্ত) যায়ঃ তার আত্মীয়-পরিজন, ধন-সম্পদ ও তার আমল (নেক বা বদ) ।অতঃপর দুটি ফিরে আসে আর একটি (তার সাথে) থেকে যায়। তার আত্মীয়-পরিজন ও সম্পদ ফিরে আসে এবং তার আমল তার সাথে থেকে যায়।(বুখারি ও মুসলিম)

৪৬২। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন , রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন; কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মধ্য থেকে দুনিয়াতে সবচাইতে যে ধনী ছিল তাকে হাজির করা হবে এবং দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, হে আদম সন্তান! তুমি কি কখনো কোনো কল্যাণ দেখেছো? তুমি কি কখনো স্বস্তি ও শান্তিতে দিন যাপন করেছো? সে বলবে, না, আল্লাহর কসম করে বলছি, হে আমার রব! কখনো না। আর জান্নাতবাসীদের মধ্যে থেকেও একজনকে হাজির করা হবে, যে দুনিয়াতে সবচাইতে দুর্দশা ও অভাবগ্রস্ত ছিল। অতঃপর তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি কখনো কোনো অভাব দেখেছ ? তুমি কি কখনো দুর্দশা ও অনটনের মধ্যে দিন যাপন করেছ? সে বলবে, না, আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি কখনো অভাব-অনটনের দেখিনি আর আমার ওপর দিয়ে তেমন কোনো দুর্দশার সময়ও অতিবাহিত হয়নি। (মুসলিম)

Advertisements
This entry was posted in বিবিধ. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s