রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণ – সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র)

আনুগত্য ও অনুসরণ প্রেম ও ভালোবাসার এক অনিবার্য ও অপরিহার্য ফসল। সাহাবায়ে কিরাম(রা) যখন প্রেম ভালোবাসার সম্পদে ধন্য হলেন তখন তাঁরা তাঁদের সকল শক্তি তাঁর আনুগত্যের পেছনে ব্যয় করলেন। আর এর সর্বোত্তম উদাহরণ হযরত সা’দ ইবন মুয়ায রাদিয়াল্লহু আনহু এর সেই বিখ্যাত উক্তি যা তিনি আনসারদের পক্ষ থেকে বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে করেছিলেন; “আমি আনসারদের পক্ষ থেকে খোলা মন নিয়ে বলছি এবং তাদের পক্ষ থেকে জওয়াবও দিচ্ছি। আপনি যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করুন, যার সঙ্গে চান সম্পর্ক স্থাপন করুন এবং যার সঙ্গে খুশি সুম্পর্ক ছিন্ন করুন, আমাদের ধন সম্পদ যা ইচ্ছা ও যতটা ইচ্ছা গ্রহণ করুন এবং যা খুশি বিলিয়ে দিন। আপনি আমাদের থেকে যা গ্রহণ করবেন তা অনেক বেশি প্রিয় ও পছন্দনীয় হবে তা থেকে যা আপনি রেখে যাবেন। যে ব্যাপারে যা কিছু আপনি হুকুম করবেন আমরা তা অবনত মস্তকে মেনে নেব এবং তার প্রতি অনুগত থাকব। আল্লাহর কসম ! আপনি যদি বার্ক-এ গামাদান পর্যন্ত চলে যান আমরাও আপনার অনুগমন করব এবং আল্লাহর কসম করে বলছি, আপনি যদি ঘোড়াসহ সমুদ্রেও ঝাঁপিয়ে পড়েন তাহলে কালবিলম্ব না করে আপনার পেছনে আমরাও তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ব”। (১)

তাঁদের আনুগত্যের আরেকটি উদাহরণ নিন! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সেই তিনজন সাহাবীর সাথে কথাবার্তা বলতে নিষেধ করে দিলেন যাঁরা তাবুক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তখনও সাহাবায়ে কিরাম (রা) সেই নির্দেশ মাথা পেতে নিয়েছিলেন। মদীনা তখন উল্লিখিত তিনজন সাহাবী(রা) এর জন্য একটি নির্জন পুরীতে পরিণত হয় যেখানে তাঁদের সাথে কথা বলার মত একটি জনপ্রাণীও ছিলনা, ছিল না তাঁদের কথার জওয়াব দেবার মত একজন মানুষও। (তাঁদের একজন) কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন;

“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের তিনজনের(যথাক্রমে হযরত কা’ব, হেলাল ইবন উমাইয়া ও মারারা ইবন রবী’আ) সঙ্গে কথা বলতে সকলকে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। লোকেরা আমাদেরকে এরপর থেকে এড়িয়ে চলতে লাগল এবং আমাদের সম্পর্কে তাদের নজরই যেন বদলে গেল, এমনকি গোটা দুনিয়াটাই বিশাল ও বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেল। যে জগৎটাকে আমি চিনতাম ও জানতাম এ যেন সেই জগত নয়, বরং সম্পুর্ণ ভিন্ন এক জগত, এমনকি আমাদের সম্পর্কে যখন লোকের উপেক্ষা আরও বৃদ্ধি পেল তখন একদিন আমি পথে বেরিয়ে পড়লাম এবং আবু কাতাদার প্রাচীর টপকে তার বাগানে ঢুকে পড়লাম। এই আবু কাতাদা আর কেউ নয়, আমারই চাচাতো ভাই, ছিল সর্বাধিক প্রিয়জন। আমি তাঁকে দেখামাত্রই সালাম করলাম অথচ কী আশ্চর্য ! আল্লাহর কসম করে বলছি, সে আমার সালামের উত্তরটা পর্যন্ত দিল না।

আমি তাকে বললাম, আবু কাতাদা ! আমি তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, তুমি তো জান, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসি।

সে চুপ করে থাকল।

আমি আমার কথার পুনরাবৃত্তি করলাম এবং তাকে আল্লাহর দোহাই দিলাম, কিন্তু তারপরও সে চুপ রইল।

আমার কথার উত্তর দিল না।

আমি আবারও সেই একই কথা বললাম এবং তাকে আল্লাহর দোহাই দিলাম। তখন সে কেবল এতটুকু বলল, এ সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল বেশি জানেন। আমার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম এবং দেয়াল টপকে বাইরে বেরিয়ে এলাম”। (২)

তাঁর আনুগত্যের আরেকটি দৃষ্টান্ত এও যে, তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অসন্তোষ ও উপেক্ষার শিকার ছিলেন। এমতাবস্থায় তাঁর কাছে আল্লাহর রাসূলের দূত এলো এবং বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাকে স্ত্রী থেকে পৃথক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বললেন; “আমি কি আমার স্ত্রীকে তালাক দেব?” দূত বলল, “না, বরং আলাদা থাকবেন, কাছে যাবেন না”। এরপর তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলে দিলেন সে যেন তার পিতৃগৃহে চলে যায় এবং সেখানেই থাকে যতক্ষণ না আল্লাহ তায়ালা তাঁদের ব্যাপারে একটা ফয়সালা করেন। (৩)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে তাঁর প্রেম ও ভালোবাসার সম্পর্কের অবস্থা ছিল এই যে, সকলের উপর তিনি তাঁকে (আল্লাহর রাসূলকে) অগ্রাধিকার দিতেন। ঠিক বয়কট চলাকালেই গাসসান অধিপতি তাঁদের প্রতি সমবেদনা ও সহানুভূতি জ্ঞাপন করে পত্র প্রেরণ করে এবং তাঁকে তার দরবারে আগমনের আহ্বান জানায়।

উপেক্ষা ও ভর্ৎসনার এই সময়টা আসলেই খুব কঠিন পরীক্ষার মুহুর্ত ছিল। কিন্তু তদসত্ত্বেও তিনি এই আহ্বান প্রত্যাখান করেন। তিনি বলেন, আমি মদীনার বাজারে ঘোরাফেরা করছিলাম। এমন সময় জনৈক সিরীয় নাবাতীয় , যে খাদ্যশস্য বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে মাঝে মধ্যে মদীনায় আগমন করত, উপস্থিত লোকদের কাছে আমার সন্ধান জানতে চায়। লোকেরা আমাকে ইশারায় দেখিয়ে দিলে সে কাছে এসে গাসসান অধিপতির একটি পত্র আমার হাতে তুলে দেয়। আমি লেখাপড়া জানতাম। পত্র পড়লাম। পত্র ছিল নিম্নরূপ;

“আমরা জানতে পেরেছি, তোমাদের মনিব তোমাদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তোমাকে লাঞ্ছনা ও অবমাননার জন্য রাখেননি এবং তোমাকে নষ্ট করতে চান না। ব্যস ! তুমি আমাদের কাছে চলে এসো। আমরা তোমার প্রতি খেয়াল রাখব ও যথোপযুক্ত মর্যাদা দেব”।

চিঠি পড়া মাত্রই আমি বুঝতে পারলাম, এও এক পরীক্ষা ! এরপর আমি পত্রটা নিকটস্থ একটি জ্বলন্ত চুলায় নিক্ষেপ করলাম। (৪)

আনুগত্য ও নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তাৎক্ষণিকভাবে তা পালনের আরেকটি উদাহরণ নিন; যা মদ হারাম ঘোষিত হবার সময় দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। হযরত আবু বুরদা তাঁর পিতার বরাতে বর্ণনা করেন;“আমরা মজলিসে বসে মদ পান করছিলাম।তারপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতে হাজির হওয়া ও তাঁকে সালাম করার নিমিত্তে উঠে পড়লাম। এদিকে ইতোমধ্যেই মদ পান হারাম হবার ঘোষণা সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয়ে গিয়েছিল; “হে মুমিনগণ! মদ,জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না”? [সূরা মায়িদা, ৯০-৯১]

আমি আমার সাথীদের কাছে এলাম এবং আমি এই আয়াত পর্যন্ত পড়ে তাদেরকে শুনিয়ে দিলাম। তিনি বলেন, সঙ্গী সাথীদের ভেতরে কারো কারো হাতে মদপূর্ণ পেয়ালা ছিল। কিছুটা পান করেছে আর পেয়ালায়ও কিছুটা অবশিষ্ট আছে, এমনকি ঠোঁট মদ স্পর্শ করেছে, এমতাবস্থায়ও তারা তক্ষুণি তা থুক করে ফেলে দিয়েছেন(আর পেয়ালাগুলো দূরে ছুঁড়ে ফেলেছেন)”।(৫)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য ও নিজের উপর, পরিবারের সদস্যদের উপর এবং বংশের লোকজনের উপর তাঁকে অগ্রাধিকার প্রদানের একটি অনন্য ও অভূতপূর্ব উদাহরণ হলো এই, (কুখ্যাত মুনাফিক সর্দার) আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সলূলের পুত্র আব্দুল্লাহকে একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডেকে পাঠান এবং বলেন; শুনেছ, তোমার পিতা কি বলছে? আব্দুল্লাহ বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! আমার পিতামাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! তিনি কি বলছেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন; বলছে, যদি মদীনায় ফিরি তো যারা সম্মানিত তারা লাঞ্ছিতদের বের করে দেবে।

আব্দুল্লাহ বললেন, আল্লাহর কসম ! ইয়া রাসুলুল্লাহ! তিনি সত্যি কথাই বলেছেন। আল্লাহর কসম ! আপনি সম্মানিত এবং তিনি লাঞ্ছিত ও অবমানিত। ইয়া রাসুলুল্লাহ ! আপনি মদীনায় তাশরীফ নিন। ইয়াসরিববাসী জানে, সেখানে আমার চেয়ে আমার পিতার সর্বাধিক অনুগত ও বাধ্য আর কেউ নেই। যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল চান, আমি তার মাথাটা (কেটে) নিয়ে আসি তাহলে তার জন্যও আমি প্রস্তুত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতে অসম্মতি প্রকাশ করে বললেন, না, আমি তা চাই না।

এরপর লোকে মদীনায় পৌঁছালে আব্দুল্লাহ মদীনার প্রবেশমুখে তলোয়ার হাতে তাঁর পিতার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর পিতা সে পথে মদীনায় প্রবেশ করতে গিয়ে পুত্র আবদুল্লাহ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হলেন। তিনি পিতাকে লক্ষ্য করে বললেনঃ

আপনি বলেছেন, মদীনায় গিয়ে যিনি সম্মানিত তিনি লাঞ্ছিতকে বের করে দিবেন? আপনি এখনই জানতে পারবেন, সম্মানিত কে। আল্লাহর কসম! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুমতি ব্যতিরেকে আপনি মদীনায় থাকতে পারবেন না।

আবদুল্লাহ ইবন উবাই তখন চিৎকার করে বলতে লাগল; ওহে খাযরাজ বংশীয় লোকেরা ! তোমরা দেখ, আমার ছেলে আমাকে আমার ঘরে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ওহে খাযরাজের লোকেরা ! আমার ছেলে আমার ঘরে আমাকে যেতে বাধা দিচ্ছে। আমাকে আমার বাড়িতে যেতে দিচ্ছে না।

লোকজন একত্র হতেই তিনি বলে উঠলেন; আল্লাহর কসম ! আল্লাহর রাসূলের অনুমতি ব্যতীত তিনি মদীনার ভেতর এক পাও ফেলতে পারবেন না। লোকে তাঁকে বোঝাতে লাগল। কিন্তু তিনি তাঁর কথায় অনড় ও অটল। তিনি বলেই চললেন; না, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুমতি ছাড়া তিনি এক পাও অগ্রসর হতে পারবেন না।

অবশেষে সকলেই নবীজী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে ছুটে গেলেন এবং তাঁকে ব্যাপারটা বললেন। তিনি তখন বলে পাঠালেন, যাও ! আবদুল্লাহকে গিয়ে বলো, সে যেন তার পিতাকে মদীনায় প্রবেশের অনুমতি দেয়।

লোকে ফিরে এসে বলতেই তিনি বলে উঠলেন, হ্যাঁ , এখন নবী করীম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুমতি পাওয়ার পর তিনি মদীনায় প্রবেশ করতে পারেন। (৬)

মূলঃ মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কি হারালো – সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী(র)

_____________

১ যাদুল মাআদ পৃ ১৩০

২ বুখারি ও মুসলিম

৩ বুখারি ও মুসলিম

৪ বুখারি ও মুসলিম

৫ তাফসির ইবন জারীর , ৭ম খণ্ড

৬ তাফসিরে তাবারী, ২৮ তম খণ্ড

Advertisements
This entry was posted in বিবিধ. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s