আল্লাহর দেয়া অবকাশকে নিরাপদ মনে করা


আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “অবশেষে তাদের যা দেয়া হল যখন তারা তাতে মত্ত হল এবং নিজেদের নিরাপদ মনে করে খুশি হল তখন আমার আযাব তাদের পাকড়াও করল যা তাদের কল্পনায়ও ছিল না”।

হযরত হাসান (রহ) বলেন; যাকে আল্লাহ প্রশস্ততা বা সুযোগ দিয়েছেন সে যদি বুঝতে না পারে যে, তাকে অবকাশ দেয়া হয়েছে তবে বুঝতে হবে যে, তার কোন দূরদর্শিতা নেই এবং যাকে দৈন্য বা অভাব অনটন দেয়া হয়েছে সে যদি বুঝতে না পারে যে, আল্লাহ তার প্রতি সুদৃষ্টি প্রদান করবেন তবে মনে করতে হবে যে, তারও কোন দুরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা নেই। এরপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করলেনঃ “তাদের যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তারা যখন তা বিস্মৃত হল-তখন তাদের জন্য সমস্ত কিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম। অবশেষে তাদের যা দেয়া হল যখন তাতে তারা মত্ত হল তখন অকস্মাৎ তাদের ধরলাম ফলে তখনই তারা নিরাশ হল”। [সূরা আন-আমঃ ৪৪]

তিনি আরোও বলেন, কোন সম্প্রদায়ের সাথে মকর(বা অবকাশ দেয়ার মানে) হল তাদেরকে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে এরপর তা নিয়ে যাওয়া। হযরত উকবা ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন তোমরা দেখবে যে, আল্লাহ তাঁর কোন বান্দাকে এমন কিছু দিচ্ছেন যা তার কাম্য এবং সে সকল বিপদ-আপদ মুক্ত তখন মনে করতে হবে যে, এটা তার জন্যে একটা অবকাশ মাত্র এবং এ অবস্থার অবসান অবশ্যম্ভাবী। [তাবারানী]

এরপর তিনি তিলাওয়াত করেনঃ “অর্থাৎ তাদের যেসব উপদেশ দেয়া হয়েছিল যখন তারা তা ভুলে গেল আমি তাদের জন্য পার্থিব উন্নতির সকল পথ উন্মুক্ত করে দিলাম। তারা এসব পেয়ে আনন্দে মত্ত হল, তখন আমি তাদের পাকড়াও করলাম। তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল”। বিপদের সময় দিশেহারা বা মুক্তি লাভের আশা ত্যাগ করাকে বলা হয় মুবলীস বা নিরাশ হওয়া।

হযরত মুয়ায (রহ) বলেছেনঃ চিন্তিত এবং হায় হুতাশ করাকে বলা হয় মুবলিস বা হতাশা। হাদীসের ভাষ্য থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ যখন ইবলিসকে পাকড়াও করলেন তখন ইবলিশ ফেরেশতাদের সাথেই ছিল। তখন জিবরাঈল (আ) ও মিকাঈল (আ) উভয়েই কাঁদতে লাগলেন। আল্লাহ বললেন, তোমাদের আবার কি হল? তোমরা কাঁদছ কেন? তারা দু’জন বললেন, হে আমাদের প্রতিপালক ! আমরা কি নিজেদের আপনার পাকড়াও মুক্ত ভাবতে পারি? আল্লাহ বললেনঃ “তার মত হলে তোমরাও আমার পাকড়াও হতে রক্ষা পাবে না”।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই এ দোয়াটি পাঠ করতেনঃ “হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী ! আমাদের অন্তরসমূহকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন”। এরপর প্রশ্ন করা হল, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! আপনি কি আমাদের বিগড়ে যাবার আশংকা করছেন? তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “বান্দার অন্তরগুলো করুণাময় আল্লাহর দু’টি আঙ্গুলের মধ্যে অবস্থিত। তিনি যেভাবে ইচ্ছা করেন সেভাবে এগুলো আবর্তন করতে পারেন”।

বুখারী শরীফে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রয়েছে, “কোন লোক হয়ত এমন আমল করতে থাকে যার দ্বারা সে জান্নাতী হতে পারে এবং সে নেক কাজ করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, তার মধ্যে এবং জান্নাতের মধ্যে কেবল এক হাত দূরত্ব রয়েছে। এমন সময় তার তাকদীর প্রাধান্য লাভ করে। সে তখন এমন কাজ করে বসে যার জন্যে তাকে জাহান্নামে যেতে হয়”।

বুখারী শরীফে হযরত সাহল ইবন সাদ আল সায়িদী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন কোন লোক জাহান্নামীদের আমল করে যাচ্ছে অথচ সে জান্নাতী আবার কেউ কেউ জান্নাতীর আমল করে যাচ্ছে অথচ সে জাহান্নামী। বস্তুত কোন ব্যক্তির শেষ জীবনের আমলই চূড়ান্ত বিবেচ্য”। আর যে কোন সময়েই আমাদের জীবনের শেষ মুহুর্ত চলে আসতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বাল’আমের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তার জ্ঞান, প্রজ্ঞার পরে তার ঈমান ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে সীস নামক আবেদ ব্যক্তিও কাফের হয়ে মারা গেছে। বর্ণিত আছে যে, মিসরে এক ব্যক্তি সর্বদা মসজিদে থাকত এবং সে নামায পড়ত ও আযান দিত। তার চেহারায় ইবাদত ও আনুগত্যের আলোকচ্ছটা প্রকাশ পেয়েছিল। একদিন সে চিরাচরিত নিয়মে আযানের জন্যে মিনারায় আরোহণ করল, মিনারের নিচে ছিল এক খৃষ্টান যিম্মির বাড়ি। সে এ বাড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করলে খৃষ্টান বাড়িওয়ালার এক সুন্দরী কন্যাকে দেখতে পেল। এরপর সে এ মেয়েটির মোহে পড়ে গেল এবং আযান ছেড়ে দিয়ে এ বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হল। মেয়েটি তাকে দেখে বলল, তুমি কেন এখানে এসেছো এবং কি চাচ্ছো? সে বলল, তোমাকে চাচ্ছি। মেয়েটি বলল, অনিশ্চয়তা ও সংশয় নিয়ে তো তোমার ডাকে সাড়া দেয়া যায় না। সে তাকে বলল, আমি তোমাকে বিয়ে করব। মেয়েটি বলল, তা কি করে হয়? তুমি তো মুসলমান, তোমার সাথে বিয়ে দিতে আমার আব্বা সম্মত হবেন না। সে বলল, আমি খৃষ্টান হয়ে যাব। মেয়েটি বলল, যদি তা হয় তাহলে আসো। এরপর সে এই মেয়েটিকে বিয়ে করার জন্য খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করল আর তাকে বিয়ে করে তাদের সাথে বসবাস করতে লাগল। এরপর সে এ দিনই ঘরের ছাদে উঠল এবং সেখান থেকে পড়ে মারা গেল। নির্মম পরিহাস, সে না দ্বীন নিয়ে কবরে যেতে পারল আর না সে এ মহিলাকে উপভোগ করে যেতে পারল। আমরা আল্লাহর কাছে তার মকরবাজির শিকার হওয়া ও অশুভ পরিণতি ও অবাঞ্ছিত পরিসমাপ্তি থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।

আব্দুল্লাহ (রা) সূত্রে সালিম থেকে বর্ণিত, নবী করীম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক সময় “হে অন্তর পরিবর্তনকারী” বলে কসম করতেন।[বুখারী] অর্থাৎ, বিচিত্র মানুষের মন ও মনন। বাতাসের গতির চেয়েও দ্রুত মানুষের মনের পরিবর্তন হয়। তাই তো দেখা যায়, হঠাৎ করে সে কোন বস্তু গ্রহণ করছে, কোনটা অপেক্ষা করছে। কোনটা কামনা করছে, কোনটা সে অপছন্দ করছে। তাই তো আল্লাহ বলেছেন, “জেনে রাখ যে, আল্লাহ তায়ালা মানুষ ও অন্তরের অন্তবর্তী স্থানে অবস্থান করেন”। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত মুজাহিদ(রহ) বলেন, আল্লাহ মানুষ ও তার বিবেকের মাঝে বাধার সৃষ্টি করেন এমনকি সে জানে না যে, তার হাতের আঙ্গুলগুলো কি করে।
“যার বিবেক রয়েছে তার জন্যে এর মধ্যে উপদেশ রয়েছে”। ইমাম তাবারী (রহ) বলেন, এটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একটি সুসংবাদ যে, তিনি বান্দার অন্তরের মালিক এবং তিনি বান্দা ও মনের মাঝে অবস্থান করেন। আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত বান্দা কিছুই করতে পারে না।

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই বলতেন, “হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! তুমি আমার অন্তরকে তোমার আনুগত্যের মাঝে স্থির রাখো”। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! আপনি তো প্রায়ই এ দোয়া পাঠ করে থাকেন, আপনারও কি ভয় হচ্ছে? তিনি বললেন, হে আয়েশা! আমিও নিরাপদ নই। মানুষের আত্মা করুণাময় আল্লাহর দুটি আঙ্গুলের মধ্যে অবস্থান করে। তিনি যে দিকে চান ফিরিয়ে দেন। যখন হেদায়েত উন্মুক্ত ও সর্বজন পরিচিত, হেদায়াতের উপর টিকে থাকা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। পরিণাম ও পরিণতি অজ্ঞতা এবং ইচ্ছাশক্তি অপরাজিত তখন তুমি তোমার ঈমান, নামায, রোযা এবং প্রতিপালকের সৃষ্টি এবং তার আত্মাভিমান করো না। এগুলো সবই তোমার প্রতিপালকের সৃষ্টি এবং তার অনুগ্রহ। তুমি যদি এর জন্যে গর্ববোধ কর তাহলে তা হবে পরের সামগ্রী নিয়ে গর্ব করার নামান্তর, অনেক সময় তা কেড়ে নেয়া হয়, তখন তোমার কল্যাণ হতে বঞ্চিত হয়। তুমি তোমার অন্তর থেকে গাধাটিকে বের করে দাও।

মূলঃ কবীরা গুনাহ –ইমাম আযযাহাবী (রহ)

লেখাটি পড়া শেষে শেয়ার করতে ভুলবেন না। আপনার মাধ্যমে শুরু হওয়া পরবর্তী প্রত্যেকের ভালো কাজের সওয়াব ও পুরষ্কারের অধিকারী হবেন ইনশাল্লাহ !
“কেহ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে,তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা, আর কেহ ভ্রান্ত পথে ডাকলে যতজন তার অনুসারী হবে প্রত্যেকের গুনাহের সমান ভাগ সে পাবে, তবে অন্যদের গোনাহে কোন প্রকার কমানো হবেনা”।
{সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪}

Advertisements
This entry was posted in ঈমান, উপদেশ, কালোত্তীর্ণ রচনাবলী and tagged . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s