বিংশ শতকের জাহেলিয়াত – ডঃ আবু আমিনাহ্ বিলাল ফিলিপস্-১

সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য এবং তাঁর সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওপর বর্ষিত হোক শান্তি ও কল্যাণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারাই সত্যের পথ অবলম্বন করবে তাদের ওপর (শান্তি ও কল্যাণ বর্ষিত হোক)।

১৪০০ বছর আগে যখন ইসলামের আবির্ভাব হয় তখনকার সময়কে বলা হত জাহেলিয়াত। মানুষ জাহেলিয়াত ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করত। ইসলামপূর্ব বা অনৈসলামিক চিন্তাচেতনা ও ভুলত্রুটিকে জাহেলিয়াতের অংশ মনে করা হত। জাহেলিয়াতের শাব্দিক অর্থ ‘অজ্ঞতা’ যা আরবী জাহ্ল শব্দ থেকে এসেছে। তবে এক্ষেত্রে অজ্ঞতা বলতে নিরক্ষরতা বোঝানো হতো না। সেসময় আরবে মুখে মুখেই বেশীর ভাগ কাজ সম্পন্ন হত। সমাজ-সভ্যতা গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাবও জাহেলিয়াত নয়। আমরা জানি আরব উপদ্বীপে এ ধরনের জ্ঞান ছিল যা সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সেসবের চিহ্ন আমরা উত্তর ও দক্ষিণ আরবে দেখতে পাই। জাহেলিয়াতের প্রকৃত অর্থ মানুষের জীবনে আসমানী বিধানের অনুপস্থিতি। সেই আরবরা বংশপরম্পরায় নিজেদের তৈরি নিয়মকানুন বা প্রথার অনুসারী ছিল। ইসলাম সে মুহূর্তে জীবনযাপন, সমাজ ও জাতি গঠনের স্বর্গীয় দিকনির্দেশনা নিয়ে এসেছিল।

আমরা যদি আজকের মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে বুঝতে পারব আমরা আসমানী বিধান আগমনের পূর্বাবস্থায় ফিরে গেছি, বর্তমানে আমরা জাহেলিয়াতের মধ্যে বাস করছি। অধিকাংশ মুসলিমই কুরআন ও সুন্নাহ এই দুই আসমানী বিধান দ্বারা পরিচালিত নয়। আমরা আমাদের নিজেদের তৈরী কিংবা বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত ধ্যান-ধারণা, রীতিনীতির অনুসারী। আমাদের রীতিনীতিগুলোও অন্যান্য জাতি থেকে ধার করা। এজন্য আজকের মুসলিমরা বিংশ শতকেও কুরআন- সুন্নাহর জ্ঞানহীন জাহেলিয়াতে অবস্থান করছে।

জাহেলিয়াতের প্রধান যে দুটি উৎস বর্তমান মুসলিম বিশ্বকে অন্ধকারে নিমজ্জিত রেখেছে তা হচ্ছে –

* ঐতিহ্যবাদ (Traditionalism)
* যুক্তিবাদ (Rationalism)

সংক্ষেপে এখানে তা আলোচনা করা হলো।
ঐতিহ্যবাদ

ঐতিহ্যবাদ হচ্ছে প্রচলিত প্রথা বা ঐতিহ্যের অন্ধ অনুকরণ, যা কিনা আজ মুসলিম বিশ্বের বহু অংশে প্রচলিত। এই অন্ধ অনুকরণ মৌলিকভাবে কালেমা শাহাদাতের শিক্ষার বিপরীত। আমরা এই কালেমাতে বলে থাকি “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু (সা)” ,অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। এই সাক্ষ্যদানের প্রকৃত মর্ম হচ্ছে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) ছাড়া আর কারো অন্ধ অনুকরণ করিনা। তিনিই একমাত্র মানব যাঁকে আমরা চোখ বুঁজে অনুসরণ করতে পারি। তিনি আমাদের কিছু করতে বললে আমরা তা করি ও কিছু করতে নিষেধ করলে আমরা তা থেকে বিরত থাকি। এর কারণ হচ্ছে তিনি আমাদের যা করতে বলেন তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই বলা হয়। আমরা যদি কাজটা করার পেছনে যুক্তি খুঁেজ পাই তবে আলহামদুলিল্লাহ, আমরা বিধানটা ভালভাবে বুঝতে পারি এবং সবসময় কার্যকর করতে পারি। কিন্তু যদি কোন কারণ খুঁেজ না পাই তবুও তার অপেক্ষায় আমরা বসে থাকিনা। তিনি অন্ধ অনুকরণের যোগ্য। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে বলেন,

‘যে আল্লাহর রাসূলকে মান্য করে সে আল্লাহকেই মান্য করে।(সূরা আন-নিসা ৪:৮০)

এই কথা আর কারো বেলায় বলা যায়না। অন্য আর কাউকে মান্য করা মানেই আল্লাহকে মান্য করা নয়। কেউ যদি আমাদের কুরআন সুন্নাহতে যা আছে তা মনে করিয়ে দেয় তবে এবং সে মোতাবেক কাজের কথা বলে তবে আমরা আসলে তাদের মান্য করিনা, মান্য করি আল্লাহকে। কিন্তু যদি কেউ নিজের মনগড়া মতবাদ প্রচার করে যা কুরআন ও সুন্নাহতে খুঁেজ পাওয়া যাবেনা তবে তাদের কথামত কাজ করলে আল্লাহকে মান্য করা হবেনা।

কিন্তু আজকের মুসলিমদের মধ্যে “তাক্বলীদ আল আ’মা” বা অন্ধ অনুকরণ গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে। এরকম দেখা যায় ভারত, পাকিস্তান, মিসর ও অন্যান্য মুসলিম দেশের মাজারে যেখানে লোকে মানুষের কবর তাওয়াফ করে, কবরে কোরবানী দেয়, কবরবাসীর কাছে দোআ চায়। এখন কেউ যদি সেখানে গিয়ে কুরআন থেকে বলে, আল্লাহ এরকম কাজে নিষেধ করেছেন বা হাদীস থেকে বলে, কবরের উপর কাঠামো নির্মাণ হারাম, তবে উল্টো কথা শুনতে হবে। তারা মনে করবে এটা বুঝি কোন নতুন ধর্ম, ইসলামের সাথে এর বুঝি কোন সম্পর্ক নেই। তারা বলবে তাদের বাপদাদারা যা বংশপরম্পরায় করে আসছে, তারা কি ভুল করেছে? তাদের থেকে আমরা বেশি জানি? সুতরাং তারা মেনেই নেবেনা। আমরা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে রাসূলুল্লাহর (সা) ধর্ম প্রচারের সময় মক্কার মূর্তিপূজারীদের এই একই ধরনের প্রতিক্রিয়ার কথা জানতে পারি:

‘এবং তুমি যদি তাদের আল্লাহ ও তাঁর বাণীর দিকে ডাকো (তখন তারা বলে) আমাদের পূর্বপুরুষরা যা করে গেছে তাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা কিছুই বুঝতনা এবং সঠিক পথে ছিলনা? ( সূরা মায়েদা, ৫:১০৪)

আজকের দিনে ঠিক একই রকম প্রতিক্রিয়া মুসলিমদের মাঝে দেখা যাচ্ছে। আমরা যা করছি তা নিয়েই আমরা সন্তুষ্ট। অবশ্যই দাওয়াতের কাজে যারা জড়িত তাদের এধরনের সমস্যায় পড়তে হয় এবং এজন্য লোকদের বোঝানোর সঠিক কর্মপন্থা বের করা দরকার। আমরা সে আলোচনায় যাচ্ছিনা, বরং দেখব কি কি ভাবে লোকেরা এ অবস্থায় এসে পৌঁেছছে। লোকেরা ১৪০০ বছর আগেকার অজ্ঞ মূর্তিপূজারীদের মত অবস্থায় ফিরে গেছে। শির্কে লিপ্ত এসব মানুষকে কুরআন সুন্নাহর কথা বলা হলে তারা বাপদাদাদের অনুসরণই যথেষ্ট মনে করে।

আমার জানামতে এই ঐতিহ্যবাদ বা অন্ধ অনুকরণের তিনটি উৎস আছে, সেগুলো হচ্ছে

* ক. বিদআত
* খ. সুফি মতবাদ
* গ. মাযহাব

ক. বিদআত (নব উদ্ভাবন):

ধর্মীয় রীতিনীতি উদ্ভাবনকে বিদআত বলা হয়। পার্শ্ববর্তী অমুসলিম দেশের রীতিনীতি বা মুসলিমদের ভিতর বসবাসকারী অমুসলিমদের প্রভাবে বিদআত জন্ম নেয়। উদাহরণস্বরূপ, রাসুলুল্লাহর (সা) জন্মদিন পালন (খ্রীস্টানদের ক্রিসমাস পালনের মত), কবরের উপর কাঠামো নির্মাণ (অন্যান্য ধর্মের মত), ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত মেয়ের পরিবার থেকে যৌতুক নেয়া ইত্যাদি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। হিন্দুদের মধ্যে যৌতুক প্রথা চালু আছে এবং মন মত যৌতুক না পেলে বউয়ের গায়ে আগুন দিয়ে তারা নতুন বউ খুঁজতে বের হয়। আমরাও এর ব্যতিক্রম নই।
খ. সুফি মতবাদ :

মুসলিম বিশ্বে সুফি মতবাদ অন্ধ অনুকরণের প্রধান উৎস। এর প্রভাব এত বেশি যে কোন সুফি, পীর বা শেখের মুরিদ না হওয়া অথবা কোন তরীকার অনুসারী না হওয়াই অস্বাভাবিক ব্যাপার। এজন্য একটি প্রবাদ আছে- যদি তোমার কোন শেখ (পীর) না থাকে তবে তোমার শেখ হলো শয়তান; তোমার কোন আধ্যাত্মিক গুরু না থাকলে শয়তান তোমাকে বিপথে নিয়ে যাবে।

সুফি মতবাদ মানুষকে অন্ধ অনুকরণ করার প্রশিক্ষণ দেয়। সুফি মতবাদের সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত অনেক লোককেই সুফিসাধক বলা হয়। সুফিসাধকদের মতে তাদের ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা) থেকে ( আসতাগফিরুল্লাহ)। তারা দাবী করে তিনিই ছিলেন প্রথম সুফি। এরপর সুফি হলেন আবু বকর (রা)। তিনি কিভাবে সুফি হলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তারা বলে, মক্কা ত্যাগের সময় আবু বকর নবীজীর (সা) সাথে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন; তখন নবীজী (সা) তাঁর কাছে সেই মারেফতী জ্ঞান দান করেন। এভাবে একজন থেকে আরেকজন করতে করতে স্থানীয় পীর পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা পৌঁছানো হয় এবং বলা হয় যে এই বিশেষ জ্ঞানের কারণেই তোমার এই পীরসাহেবের অনুসরণ করা কর্তব্য।

সেই পীরের ঐ মারেফতী জ্ঞান ও কর্তৃত্ব থাকার কারণে সবাইকে তার অনুসরণ করতে হবে; তার মুরীদ হতে হবে- মুরীদ হওয়া অর্থ হচ্ছে নিজের ইচ্ছাকে তার ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করতে হবে। এজন্য আমরা দেখতে পাই সুফি শেখরা তাদের মুরিদদের আত্মসচেতনতাকে (ইগো) দমন করার নানা পদ্ধতি বাত্লে দেয়, কেননা আত্মসচেতনতা লোপ পেলে আল্লাহর সাথে এক হয়ে যাওয়া যায় (!)। তাদের এসব পদ্ধতি সব রকমের অপমানকর কাজ করতে শেখায়। সুফিদের বই পড়লে দেখা যায় তারা মুরিদদের মাথায় মোজা বেঁেধ খালি পায়ে শহরে যেতে বলে, এরকম যতসব আজগুবি কান্ডকারখানা সমাজের কাছে একজনকে হাস্যকর করে তোলে। এভাবে সবাই আঙ্গুল তুলে দেখালে, ভাঁড় বা পাগল ভাবলে তবেই আত্মসচেতনতা (ইগো) দমন হবে। একেক পীরের ক্ষেত্রে নিদের্শনাও একেক রকম হয়ে থাকে।

তারা একনাগাড়ে যিকিরও করতে শেখায়। সকাল বিকাল হাজার বার কিছু জিনিস বলাকে যিকির বলা হয়। তাদের এই যিকির করতে বসলে সারাদিন পার হয়ে যায়। তারা এই যিকির দুইভাবে করে, প্রথমত আল্লাহর কোন নাম নিয়ে বার বার বলতেই থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা) আমাদের কখনো এরকম করতে শেখাননি। আমরা যদি তাঁর নির্দেশিত কোন দোআ পড়ি, তাহলে দেখতে পাব সেটি একটি বাক্য বা উক্তি আকারে আছে, শুধুমাত্র শব্দ দিয়ে দোআ করা হয়নি। কারো সাথে ভাব বিনিময় করতে হলে আমরা মুখে বাক্য বলে থাকি, যেমন “মোহাম্মদ আমাকে কাজে সাহায্য করো।” আমরা শুধু মোহাম্মদ, মোহাম্মদ, মোহাম্মদ.. বলিনা। এরকম করলে লোকে এমবুলেন্স ডেকে মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবে। যেকোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ বুঝবে আমরা কথা বলতে শিখিনি। আমরা সাহায্য দরকার হলে বলিনা সাহায্য, সাহায্য, সাহায্য.. , কিসের জন্য সাহায্য? এসবের কোন অর্থই হয়না। এভাবে কেউ ভাব বিনিময় করেনা। কিন্তু সুফিরা এই কাজটি করে; তারা আল্লাহর একটি নাম বেছে নেয় – আল খালিক, আল রাজিক, আর রাহিম এবং বার বার বলতে থাকে। বলতে বলতে একসময় পরে বোঝাই যায়না আসলে তারা আল খালেক বলছে না অন্যকিছু।

দ্বিতীয় ধরনের যিকিরে আল্লাহর একটি নাম নেয়া হয়, নকশবন্দীরা (একটি সুফি সমপ্রদায়) এটি বেশি করে; তারা আল্লাহু বলে শুরু করে কিন্তু শেষ করে হু দিয়ে। তাদের যিকির শুনলে মনে হয় কুকুরের বিলাপ .. হু হু হু । তারা মনে করে এতে আল্লাহ খুশি হবেন। একদিকে তারা আল্লাহর কাছে অগ্রহণযোগ্য অদ্ভুত সব এবাদতে লোকদের সামিল করে আর অন্যদিকে তাদের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। এসব পীরদের মুরিদরা নিজেদের সর্বস্ব সপেঁ দেয় এবং তাদের গুরুদের খুব কমই শয়তানের কুমন্ত্রণাকে অগ্রাহ্য করতে পারে; যার ফলে মুরিদদের থেকে ফায়দা লুটতে থাকে। এজন্য আমরা আজ সমাজে দেখি ধর্মীয় সমপ্রদায়ের নেতা, চার্চের মুরুব্বীরা শিশুদের নিয়ে নিজেদের যৌন আকাঙ্খা চরিতার্থ করছে। এসব শিশুরা তাদের সবকিছু সরলবিশ্বাসে সঁেপ দেয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় জিম জোনসের কথা, যে ১৯৭৯ সালে নয়শজন অনুসারী নিয়ে গায়ানাতে আত্মহত্যা করেছিল। তার অনুসারীরা তাকে খোদা মনে করত। যারা বেঁেচ গেছে তারা আমেরিকায় চলে আসে। তারা সবাইকে জানায় সে সংগঠনের ভিতরকার কথা; সে এক সীমাহীন দুরাচার- জনে জনে শিশু, পুরুষ ও নারীদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক আর সেই সাথে মাদকদ্রব্যের ছড়াছড়ি। এরকম আরেকজন হচ্ছে আমেরিকার ডেভিড কুরেইশ, যে কিনা কয়েকবছর আগে নিজেকে খোদা দাবী করেছিল, বুঝিয়েছিল যিশু খ্রীস্টরূপে তার আগমন। তার কার্যকলাপও একইরকম ছিল। অন্যরা খোদা মনে করে তার এসব অনাচার মেনে নিত। মুনীদের প্রতিষ্ঠাতাও একই ধরনের। হিন্দুদের মধ্যে রজনিশ কোন রাখঢাক করেনি, তাকে বলা হত “প্রেমগুরু”। তার মতে আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটাতে হলে আগে সবরকমের যৌন বাসনা পূর্ণ করতে হবে; এজন্য সে অবাধ মেলামেশা করতে শিখিয়ে গেছে।

সুফিদের ক্ষেত্রেও এরকম ব্যাপার খুঁেজ পাওয়া যায়। বছরের পর বছর এসব তরীকা অনুসারীদের নিয়ে কি করছে তা জানলে হতবাক হতে হয়। তারা বলে আমরা যদি কোন পীরকে বা খাদেমকে কোন খারাপ কাজ করতে দেখি তবে তা বিচার করার ক্ষমতা আমাদের নেই, আমরা এসব বিচার করার মত আধ্যাত্মিক শক্তি-স্তরে উপনীত হইনি। যেমন ধরা যাক খিজির (আ) ও মুসা (আ) এর কাহিনী। অনেক আলেম খিজিরকে (আ) নবী বলে থাকেন, তবে এ ব্যাপারে তেমন কোন স্পষ্ট প্রমাণ নেই। খিজির (আ) এমন কিছু কাজ করেছিলেন যা মুসা (আ) এর বোধগম্য হয়নি। যেমন তিনি একটি বালককে হত্যা করেছিলেন, নৌকা ছিদ্র করেছিলেন এবং পরে এসব দৃশ্যত খারাপ কাজ মুসা (আ) এর কাছে ব্যাখ্যা করেছিলেন। সুফিদের মতে খিজির (আ) একজন সুফি শেখ এবং তিনি এখনও বেঁেচ আছেন। তিনি পীরদের সাথে বসেন এবং তাদের গাইড করেন। তিনি খ্রীস্টানদের মেলচিডেসেক এর মত চিরজীবন্ত। তিনি পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং সবচেয়ে শক্তিধর পীরদের বিশেষ পথপ্রদর্শক।

সুফিরা তাদের অনুসারীদের সাথে সম্পর্ককে খিজির (আ) ও মুসা (আ) এর সাথে তুলনা করে। কিন্তু এটা সত্য হতে পারেনা। যখন কোন পীর মদ্যপান করেন তিনি তখন তার মুরিদদের বলেন এটা তোমাদের কাছে সাধারণ মদ মনে হতে পারে কিন্তু আসলে এটি জান্নাতের শরাব ( যদিও এটি নিকটের দোকান থেকে কেনা জনি ওয়াকারের বোতল থেকে সবার সামনে ঢালা হয়েছে); এরপর এর পেছনে একটা মারেফতী কাহিনীও সে শুনিয়ে দেয়া হয়। সারা পৃথিবীতে এভাবে পীরেরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে চলেছে।

গতবছর আমি যখন ইংল্যান্ডে ছিলাম, সেখানের টিভিতে তখন স্থানীয় পীরদের উপর একটা অনুষ্ঠান করা হয়। তারা এক পীরকে বেছে নিয়েছিল যে বেশ কয়েকটা বাচ্চা মেয়ের সম্মানহানী করেছে। একজন সাংবাদিক সেসব মেয়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। তারা কয়েকবছর পর একটা মেয়ের ব্যাগে লুকানো ক্যামেরা দিয়ে ঐ পীরের কাছে পাঠায়। ঐ মেয়েকে পীরসাহেব তের চৌদ্দ বছর বয়সে শ্লীলতাহানী করেছেন। সেই মেয়েকে (তার বয়স তখন বিশের কাছাকাছি) পীরসাহেব চিনতে পারেন। মেয়েটি পীরের কাছে হেদায়েত কামনা করে। পীরসাহেব হেদায়েত দেবার আশ্বাস দেন কিন্তু বলেন এর আগে তার সাথে কোলাকুলি করতে হবে, তার পুরুষাঙ্গ ধুয়ে দিতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। পুরো ব্যাপারটাই লুকানো ক্যামেরায় জাতীয় টেলিভিশনে দেখানো হয়। এরপর সেই মহিলা সাংবাদিক পীরের কাছে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে এসব অভিযোগ তোলেন। পীরসাহেব জবাবে বলেন, না না না এটা কিভাবে সম্ভব? আমি সত্তুর বছরের বৃদ্ধ, আমি সবসময় এবাদত বন্দেগিতে মগ্ন থাকি। আমি একজন সাধারণ মানুষ, আমি লোকদের সাহায্য করার চেষ্টা করি। আমি কুরআন ছুঁেয় শপথ করে বলছি আমি কখনো এসব খারাপ কাজ করিনি। সুফি মতবাদের কারণে আজকে মুসলিম উম্মাহর এই দশা!
গ. মাযহাব:

মাযহাব কয়েক প্রকার – হানাফী, শাফিঈ, মালিকি ও হাম্বলী। সুফি মতবাদের মত আমাদের বলা হয় যে কোন মাযহাবের অনুসারী হতে; যার কোন ইমাম নেই তার ইমাম শয়তান; সব মাযহাবই শুদ্ধ, তাই যে কোন একটি অনুসরণ করতেই হবে।

আমাকে বলা হয়েছিল আমি তাত্ত্বিকভাবে যেকোন মাযহাব অনুসরণ করতে পারি তবে বেশিরভাগ মুসলিমরাই হানাফী; উপরন্তু ইমাম আবু হানিফা হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম বা ইমাম-ই-আজম। তাই হানাফীদের পাল্লাই ভারি। এজন্য ইসলাম গ্রহণের পর আমি হানাফী মাযহাবের অনুসারী হলাম। বাড়ি ফিরে আমি স্ত্রীকে বললাম, মন দিয়ে শুনো, আমরা কিন্তু এখন থেকে হানাফী। এরপর আমি জানতে পারলাম হানাফী মহিলারা বিশেষ কায়দায় নামায পড়ে। নারী পুরুষের নামায হানাফী মতে ভিন্ন। আমি জ্ঞানের সন্ধানে বের হয়ে, পড়াশোনা করে মহিলাদের নামায শিখলাম। সাধারণ মানুষের পক্ষে সে নামায পড়া সম্ভব না, আমার কাছে হানাফী মহিলাদের নামায এক্রোব্যাটিক চর্চা মনে হয়েছে। আমি স্ত্রীকে শুদ্ধভাবে নামায পড়তে শেখানোর জন্য তা রপ্ত করেছিলাম। পরবর্তীতে আমি আরো পড়াশোনা করার পর বুঝতে পারলাম এভাবে নামায পড়তে রাসুলুল্লাহ (সা) নিষেধ করেছেন। তিনি কনুই মাটিতে রাখতে, বুক উরুতে রাখতে ও ৪৫০ না ঝুকঁতে নিষেধ করেছেন যা কিনা হানাফী মহিলারা করে থাকেন।

মাযহাব নিয়ে অতীতের গোঁড়ামির ফলাফলও আমাদের জানা আছে। ১৩শ শতকে (১২৫৮ খ্রীস্টাব্দ) বাগদাদের পতনের পর এ গোঁড়ামি চরম আকার ধারণ করে। সেসময় কেউ মাযহাব পরিবর্তন করলে মুসলিম বিচারকদের শাস্তি দেয়ার অধিকার ছিল; অর্থাৎ এ কাজটি ছিল অপরাধতুল্য। হানাফী মতে একজন হানাফী মহিলা একজন শাফিঈ পুরুষকে বিবাহ করতে পারেনা। মসজিদগুলোতে দুই থেকে চারটি মেহরাব দেখা যেত। এখনও সিরিয়ায় গেলে এধরনের মসজিদ দেখা যায়; প্রধানত দুইটি মেহরাব হচ্ছে হানাফি ও শাফিঈদের জন্য। কাবার পুরানো ছবি দেখলে দেখা যাবে কাবা ঘরের চারপাশে চারটি মাকাম (স্তম্ভ ও ছাদসহ দেয়ালহীন কাঠামো) ছিল- মাকাম হানাফী,মাকাম শাফিঈ, মাকাম হাম্বলী ও মাকাম মালিকী। নামাযের সময় হলে হানাফী ইমাম আসেন, ইকামত দেয়া হয় এবং সব হানাফীরা তাওয়াফ করে কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। তাদের নামায শেষ হলে শাফিঈ ইমাম উঠে দাঁড়ান এবং শাফিঈদের নামায পড়ান। এভাবে কাবা ঘরে চারটি পৃথক জামাত চালু ছিল। বিশের দশকের মাঝামাঝি, আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে পর্যন্ত এটাই ছিল নিয়ম। এখন সে অবস্থার অবসান হয়েছে। আজকাল হানাফিরা শাফিঈদের বিয়ে করতে পারে, এতে কেউ আপত্তি করেনা। কাবাঘরেও একটাই জামাত অনুষ্ঠিত হয়, আলহামদুলিল্লাহ। তবে এখনও অনেক মানুষের মনে মাযহাব প্রীতি গভীরভাবে প্রোথিত। সব মাযহাবই ঠিক – এই প্রবণতা মুসলিমদের খ্রীস্টানদের মত অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে। খ্রীস্টানরা যেমন মানতে বাধ্য ১+১+১=১, তেমনি বিবেক বুদ্ধি জলাঞ্জলি দিয়ে অন্ধভাবে এসব মেনে নিতে হয়। আমাদের মন যদিও বলে ১+১+১=৩ কিন্তু সত্যিকারের খ্রীস্টান হতে হলে একের ভিতর তিন ঈশ্বরকে মেনে নিতে হয়। অনুরূপে মুসলিমরা যখন মাযহাব অনুসরণ করে তখন তারা বাধ্য হয়ে মেনে নেয় একটা জিনিস একই সময়ে ঠিক বা বেঠিক হতে পারে। একজনের একই সময়ে অযু থাকতে পারে আবার নাও পারে। হানাফী মতে কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে কোন মহিলাকে স্পর্শ করলে অযু ভাঙ্গবেনা। কিন্তু শাফিঈ মাযহাব মোতাবেক এমন পরিস্থিতিতে অযু ভাঙ্গবে। তাই দুটিই যদি ঠিক হয় তাহলে একই সময়ে অযু আছে আবার নেই। ব্যাপারটা তাই অযৌক্তিক। মাযহাবের অন্ধ অনুসারীদের এজন্য চিন্তাভাবনার দুয়ার বন্ধ করে দিতে হয়। প্রকৃতপক্ষে তারা ইসলামের মূলধারার থেকে বিছিন্ন। কুরআন সুন্নাহর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেই এরকম অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণ মানুষকে বলা হয় হাদীসের বই না পড়তে, কারণ তা নাকি বোধগম্য নয়। ক্যাথলিক ধর্মগুরুরা যেমন বলে বাইবেল পড়োনা, পড়লে মতভেদ সৃষ্টি হবে; এজন্য তারা যা বলবে তাই গ্রহণ করতে হয়। এক পর্যায়ে গিয়ে আমাদের বলা হয় কুরআন পড়োনা। আমাদের বাধাধরা নিয়মে কুরআন পড়তে বলা হয়, আমরা তাই কুরআন না বুঝে তেলাওয়াত করতে অভ্যস্ত। আল্লাহ কোরানে আমাদের কি বলছেন তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। এজন্য আমরা পশ্চিমা দেশে এমন দুর্নীতিবাজ লোকও পাই যারা কিনা ছোটবেলায় কুরআন খতম দিয়ে এসেছে। কুরআনের কোন প্রভাবই তাদের মধ্যে দেখা যায়না।

কুরআনকে অনেকে মন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। যখন কেউ বাচ্চার নাম রাখতে চায় তখন কুরআনের মধ্যে খুজঁতে শুরু করে। তারা কুরআন নিয়ে প্রথমে একটা পাতা খুলবে, এরপর চোখ বন্ধ করে আঙ্গুল দিয়ে যে কোন শব্দতে আসবে;যে শব্দটা পাওয়া যাবে সেটাই বাচ্চার নাম। এজন্য আমরা দেখি অনেকের নাম বিসমিল্লাহ। আমার সাথে দুই বোনের দেখা হয়েছিল যাদের নাম ছিল নাহ্ল ( নাহল অর্থ মৌমাছি) ও নমল (নমল অর্থ পিপড়া)।

আমাদের যদি কোন সিদ্ধান্ত নিতে হয় তবে আমরা ইস্তিখারার নামায পড়ি। কিন্তু অনেকেই এ কাজটি করতে চাননা। এর বদলে তারা কুরআন নিয়ে কয়েক লাইন নিচে নামে, কি কি করতে হবে এর জন্য একটা বইও পারলে সাথে রাখে। উদাহরণস্বরূপ তারা কুরআনের যেকোন একটা পাতা মেলে তিন লাইন নিচে নামে, চতুর্থ শব্দটার প্রথম বা তৃতীয় অক্ষর দেখে, এরপর অক্ষরটা সারণীতে মিলিয়ে নেয়। যদি অক্ষরটা লাম হয় তবে সেখানে লেখা থাকে কি করতে হবে,কোনটা না করা ভাল অথবা যদি অক্ষরটা মীম হয় তবে ঐটা করতে হবে ইত্যাদি। মানুষ এভাবে কুরআন ব্যবহার করছে। এর তুলনা চলে চীনাদের আইচিং বইয়ের। তারা কতগুলো কাঠি নিক্ষেপ করে এবং কাঠিগুলো কিভাবে পড়ল তা দেখে বইটা থেকে জানতে পারে এভাবে বা ঐভাবে হলে কি অর্থ দাঁড়ায়।

ইস্তিখারা নামাযকেও মানুষ জ্যোতিষিদের ক্রিস্টাল বলের মত করে ফেলেছে। নামায পড়ে স্বপ্নের জন্য মানুষ অপেক্ষা করে, স্বপ্নই বলে দেবে কি করতে হবে। যদি স্বপ্ন না দেখে তবে আগামীদিন আবার ইস্তিখারা পড়ে। এভাবে দশ পনেরোবার নামায পড়ে ফেলে স্বপ্নের আশায়। রাসুলুল্লাহ (সা) কখনো স্বপ্নের কথা বলেননি, কিন্তু অধিকাংশ মুসলিমই ভাবে স্বপ্ন দেখতে হবে। আমার ছেলের কিছু করার থাকলে আমি ইস্তিখারা পড়লাম অথবা কোন মোল্লাকে আমার ছেলের জন্য নামায পড়ে দিতে বললাম, এর সবই রাসুলুল্লাহর (সা) শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। একে ইস্তিখারা নামায বলা যায়না। ইস্তিখারা নামায হচ্ছে যখন কেউ মনে মনে কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয় তখন দুই রাকাত নামায পড়ে আল্লাহর কাছে বলে, সর্বজ্ঞানী আল্লাহ যেন তার এই সিদ্ধান্ত এই জীবন ও পরকালের জন্য শুভ হলে কাজটা সহজ করে দেন এবং শুভ না হলে কাজটা কঠিন করে দেন। এই পদ্ধতি অতীব সহজ সরল ও বোধগম্য। আপনি কি করতে হবে বুঝতে না পারলে ইস্তিখারা নামায পড়বেন, ব্যাপারটি তা নয়। এ অবস্থায় এ নামায নয়। আমাদের প্রথমে অবস্থা বুঝে সবচেয়ে ভাল সিদ্ধান্তে পৌছঁতে হবে, এরপর আল্লাহর কাছে দোআ করতে হবে এই সিদ্ধান্ত কি আমার জন্য ঠিক? যদি ঠিক হয় তবে আমার জন্য তা সহজ করো আর ভুল হলে কঠিন করো। এটাই হচ্ছে ইস্তিখারা নামাযের সঠিক পদ্ধতি।

এভাবে আমাদের ধর্মটা মন্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, ভবিষ্যতবাণী, তাবিজে-কবজের সমষ্টিতে পরিণত হয়েছে। আমরা আসলেই এক জাহেলিয়াতের মাঝে বসবাস করছি।

Advertisements
This entry was posted in ইসলাম ও সমাজ. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s