তাওহীদের প্রকারভেদ


তাওহীদ এবং এর শ্রেনী বিভাগ

তৌহিদের আক্ষরিক অর্থ একীকরণ (কোন কিছু এক করা) অথবা দৃঢ়ভাবে এককত্ব ঘোষণা করা এবং এটার উৎপত্তি আরবী ‘ওয়াহহাদা’ শব্দ হতে যার অর্থ এক করা, ঐক্যবদ্ধ করা অথবা সংহত হওয়া। কিস্তু যখন তৌহিদ শব্দটি আল্লাহর (অর্থাৎ তৌহিদুল্লাহ) সম্বন্ধে ব্যবহৃত হয় তখন আল্লাহ সম্পর্কিত মানুষের সকল পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ কর্মকান্ডে আল্লাহর এককত্ব উপলদ্ধি করা ও তা নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্ষুন্ন রাখা বুঝায়। আল্লাহ এক, তাঁর আধিপত্যে এবং তাঁর কর্মকান্ডে (রবুবিয়াহ) কোন শরীক বা অংশীদার নেই। এটাই বিশ্বাস যে, আল্লাহ একক, তাঁর রাজত্বে এবং কর্মে কোন শরীক নেই (রবুবিয়াহ)। তিনি তাঁর মৌলিকত্বে এবং গুণাবলীতে অতুলনীয় (আসমা ওয়াস সিফাত) এবং উপাস্যরূপে চির অপ্রতিদ্বন্দ্বী (উলুহিয়াহ/ইবাদাহ)। এই তিনটি বিষয়কে ভিত্তি করে তাওহীদের শ্রেণী বিন্যাস করা হয়েছে। এই শ্রেণী তিনটি পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং একটির সঙ্গে অপরটি এতই অবিচ্ছেদ্য যে, কেউ যদি একটি বিষয় বাদ দেন তাহলে তিনি তাওহীদের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হবেন। উপরে বর্ণিত তাওহীদের যে কোন একটি বিষয় বাদ দেয়াকে “শির্ক” (অংশীদারী) বলে; আল্লাহকে অংশীদারদের সঙ্গে সংযুক্ত করা, যা ইসলাম অর্থে প্রকৃতপক্ষে পৌত্তলিকতা।

তাওহীদের তিন শ্রেণীকে সাধারণতঃ নিম্নলিখিত শিরোনামে উল্লেখ করা হয়ে থাকেঃ
১) তাওহীদ আর-রবুবিয়াহ (প্রতিপালকের এককত্ব অক্ষুন্ন রাখা)
২) তাওহীদ আল-আছমা ওয়াছ ছিফাত (আল্লাহর নাম ও গুনাবলীর এককত্ব বজায় রাখা)
৩) তাওহীদ আল-ইবাদাহ (আল্লাহর ইবাদতের এককত্ব বজায় রাখা)

রাসুল (সঃ) এর সময় তাওহীদের মূল তত্ত্বগুলি এমনভাবে বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল না বিধায় রাসূল (সাঃ) অথবা তাঁর সাহাবাগণ কর্তৃক তাওহীদকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়নি। তা সত্ব্ওে,কোরআনের আয়াত এবং রাসূল (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণের ব্যাখ্যামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে তাওহীদের শ্রেণীগুলি ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে।

তাওহীদ আর-রবুবিয়াহ –
তাওহীদ আর-রবুবিয়ার মূল কথা হচ্ছে যে যখন কিছুই ছিল না তখন আল্লাহ একই সকল সৃষ্টিকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দেন; সৃষ্টি থেকে অথবা সৃষ্টির জন্য কোন প্রয়োজন মেটানোর কারণ ব্যতিরেকেই আল্লাহ সৃষ্ট জগৎ প্রতিপালন করেন। তিনি সমগ্র বিশ্ব ও এর অধিবাসীদের একমাত্র প্রভু এবং তাঁর সার্বভৌমত্বের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আরবী ভাষায় “রবুবিয়াহ” শব্দটির মূল ধাতু হচ্ছে “রব” (প্রতিপালক) যা একই সাথে সৃষ্টি ক্ষমতা এবং প্রতিপালন উভয় গুণের পরিচয় বহন করে। এই শ্রেণী বিন্যাস অনুযায়ী আল্লাহই একমাত্র সত্যিকার শক্তি, তিনিই সকল বস্তুর চলাফেরা ও পরিবর্তনের ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি যেটুকু ঘটনা ঘটাতে দেন সেটুকু ব্যতীত সৃষ্টি জগতে কিছুই ঘটে না। এই বাস্তবতার স্বীকৃতি স্বরূপ রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) প্রায়ই “লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”(আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোন বিচলন অথবা ক্ষমতা নেই) বলে বিস্ময়সূচক উক্তি করতেন।

কোরআনের বহু আয়াতে রবুবিয়াহ আকীদার ভিত্তি পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ বলেছেন-

“আল্লাহ সমস্ত কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা।” (সূরা আয-যূমার ৩৯: ৬২)
“প্রকৃত পক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করিয়াছেন তোমাদিগকে এবং তোমরা যাহা কর তাহাও।” (সুরা আছ্-ছাফফাত ৩৭: ৯৬)
“এবং তুমি যখন নিক্ষেপ করিয়াছিলে তখন তুমি নিক্ষেপ কর নাই, আল্লাহই করিয়াছিলেন।” (সূরা আল্-আনফা’ল ৮: ১৭)
“আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোন বিপদই আপতিত হয় না।” (সূরা আত্-তাগাবুন ৬৪: ১১)

রাসূল (সঃ) এই ধারণার আরও বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন,

“সাবধান, যদি সমস্ত মানব জাতি তোমাকে সাহায্য করার জন্য কিছু করতে চায়, তারা শুধু অতটুকুই করতে সক্ষম হবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য আগেই লিখে রেখেছেন। অনুরূপ, যদি সমস্ত মানব জাতি ক্ষতি করার জন্য একত্রিত হয়, তারা শুধু ততটুকুই ক্ষতি করতে সক্ষম হবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য আগেই লিখে রেখেছেন।”

কাজেই, মানুষ যা সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য বলে ধারণা করে তা শুধুমাত্র এই জীবনের পুর্ব নির্ধারিত পরীক্ষার অংশ। আল্লাহ যে ভাবে নির্ধারণ করে রেখেছেন সেই ভাবেই ঘটনাসমূহ সংঘটিত হয়। আল্লাহ কোরআনে উলেখ করেছেন,

“হে মু’মিনণ! তোমাদিগের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে তোমাদিগের (কিছু) শত্র“ রহিয়াছে; অতএব তাহাদিগের সম্পর্কে তোমরা সর্তক থাকিও।” (সূরা আত্-তাগা’বুন ৬৪:১৪)

অর্থাৎ

“মানুষের জীবনের ভাল জিনিসের মধ্যেও আল্লাহর উপর বিশ্বাসের কঠিন পরীক্ষা নিহিত আছে। অনুরূপভাবে,জীবনের কঠিন ও ভয়াবহ ঘটনাবলীতেও পরীক্ষা নিহিত রয়েছে; যেমন আয়াতে উল্লেখ হয়েছেঃ “নিশ্চয়ই আমি তোমাদিগকে ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করিব। তুমি ধৈযশীলগণকে শুভ সংবাদ দাও।” (সূরা আল্-বাকারা ২:১৫৫)

কখনও কখনও জীবনের ঘটনাগুলো উপলদ্ধি ও ব্যাখ্যা করা সহজ যখন কার্যকরণ অনুযায়ী ফলাফল ঘটে। আবার কখন উপলদ্ধি করা কঠিন যখন আপাতঃ দৃষ্টিতে মন্দ কাজের সুফল অথবা ভাল কাজ থেকে খারাপ ফল আসে। আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে,সীমিত জ্ঞানের জন্যে এই ধরনের আপাতঃ অনিয়মের পেছনে কি বিজ্ঞতা রয়েছে তা মানুষের প্রত্যক্ষ উপলদ্ধির বাইরে।

“কিন্তু তোমরা যাহা পছন্দ কর না সম্ভবতা তাহা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং যাহা পছন্দ করা সম্ভবতা তাহা তোমাদের কাছে অকল্যাণকর।” (সূরা-আল বাকারা ২: ২১৬)

মানুষের জীবনে আপাতঃ অকল্যাণকর ঘটনা কখনো শেষ পর্যন্ত কল্যাণকর বলে প্রমাণিত হয় এবং আপাতঃ কল্যাণকর জিনিস যা মানুষ পছন্দ করে তা শেষ পর্যন্ত অকল্যাণকর হয়। জীবনে যে সব সুযোগ আসে তা থেকে পছন্দ করে জীবন গড়ার মধ্যেই মানুষের প্রভাব সীমাবদ্ধ- সুযোগের প্রকৃত ফলাফলের উপর মানুষের কোন ক্ষমতা নেই। অন্য কথায়- “মানুষ প্রস্তাব করে, স্রষ্টা নিষ্পত্তি করে।”

তাওহীদুর রবুবিয়্যার প্রতি ঈমানের দাবী হচ্ছে নিম্নে লিখিত ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ব মেনে নেয়াঃ

১) “আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা”- সূরা আন‘আম ৬:১০২/ আরাফ ৭:৫৪/ যুমার ৩৯:৬৫/ সাফফাত ৩৭:৯৬।
২) “তিনিই আসমান, যমীন এবং এর মধ্যবতী সবকিছুর প্রতিপালক”- সূরা ফাতিহা ১:১/ শুয়ারা ২৬:২৪/ নাস ৪:১।
৩) “তিনিই সবপ্রানীর একমাত্র জীবিকা দাতা”- সূরা হুদ ১১:৬/ যারিয়াত ৫১:৫৮।
৪) “সমস্ত কিছুর একচ্ছত্র মালিকানা তাঁরই”- সূরা বাকারা ২:২৫৫/ মু’মিনুন ২৩:৮৪-৮৫।
৫) “আল্লাহই আসমান-যমীন সহ সব কিছুর পরিচালনাকারী”- সূরা সাজদা ৩২:৫।
৬) “আল্লাহই আসমান, যমীন এবং এর মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর একচ্ছত্র কতৃর্ ত্বের অধিকারী”- সূরা মু’মিনুন ২৩:৮৮।
৭) “আল্লাহই একমাত্র সার্বভৌমত্বের অধিকারী”- সূরা আলে ইমরান ৩:২৬/ ফোরকান ২৫:২/ আরাফ ৭:১৫৮।
৮) “আল্লাহই একমাত্র আইন-বিধান দাতা, হালাল-হারাম ঘোষনাকারী”- সূরা ইউসুফ ১২:৪০/ আরাফ ৭:৫৪/ রাদ
১৩:৪১/ কাসাস ২৮:৭০, ৮৮/ আন’আম ৬:৫৭/ ১০:৫৯/ ৯:৩৭/ ৫:৫০/ নাহল ১৬:১১৬।
৯) “তিনিই ভাল-মন্দ নির্ধারণকারী, সাহায্যকারী, বিপদাপদ দাতা এবং মুক্তিদাতা, রক্ষাকর্তা”- সূরা তাগাবুন ৬৪:১১/
ইউনুস ১০:১০৭/ আন’আম ৬:৬৪/ আলে ইমরান ৩:২৬/ ৭:১৮৮/ ৩:১৫০/ ৩৬:৭৪-৭৫।
১০) “তিনিই একমাত্র সন্তানদাতা এবং জীবন-মৃত্যুর মালিক”- সূরা শুরা ৪২:৪৯-৫০/ হাজ্জ ২২:৬৬।
১১) “তিনিই একমাত্র গায়েব বা অদৃশ্যের জ্ঞানী”- সূরা আন’আম ৬:৫৯/ নামল ২৭:৬৫/ লুকমান ৩১:৩৪।

তাওহীদ আল্-আছ্মা ওয়াছ-ছিফাত (আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর এককত্ব বজায় রাখা)-
এই শ্রেণীর তাওহীদের পাঁচটি প্রধান রূপ আছেঃ

১) আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর এককত্ব বজায় রাখার প্রথম শর্ত হ’ল, কোরআন এবং হাদিসে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) আল্লাহর যেভাবে বর্ণনা দিয়েছেন সেভাবে ছাড়া আর কোনভাবে আল্লাহর নাম এবং গুণাবলীর বর্ণনা দেয়া যাবে না। তিনি বলেন,

“এবং মুনাফিক পুরুষ ও নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও নারী যাহারা আল্লাহ সম্বন্ধে মন্দ ধারণা পোষণ করে তাহাদিগকে তিনি শাস্তি দিবেন। উহাদিগের চারিদিকে অমঙ্গল চক্র, আল্লাহ উহাদিগের প্রতি রাগ করিয়াছেন,উহাদিগকে অভিশপ্ত করিয়াছেন এবং উহাদিগের জন্য অমঙ্গল পরিণতি প্রস্তুত রাখিয়েছেন।” (সূরা আল্-ফাত্হ্ ৪৮: ৬)

কাজেই ক্রোধ আল্লাহর গুণাবলীর একটি। এটা বলা ভূল হবে যে, যেহেতু ক্রোধ মানুষের মধ্যে একটি দুর্বলতার চিহ্ন যা আল্লাহর জন্য শোভন নয় সেহেতু আল্লাহর ক্রোধ অবশ্যই তাঁর শাস্তি বুঝায়। “কোন কিছুই তাঁহার সদৃশ নহে” (সূরা আশ্-শূরা ৪২: ১১) আল্লাহর এই ঘোষণার ভিত্তিতে আল্লাহর ক্রোধ যে মানুষের ক্রোধের মত নয় তা গ্রহণ করতে হবে। তথাকথিত “বিজ্ঞতাপূর্ণ” (rational interpretation) ব্যাখ্যা অনুযায়ী যখন যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্তে পৌছান যায় তখন তা নাস্তিকতার জন্ম দেয়। (অনুবাদকের মতামতঃ “rational interpretation” দ্বারা খুব সম্ভবত লেখক আবু আমিনাহ এটাই বলতে চেয়েছেন যে যেহেতু “কোন কিছুই তাঁহার সদৃশ নহে” (৪২: ১১) কাজেই আল্লাহ মানুষের মত এবং যেহেতু মানুষের প্রাণ আছে কাজেই আল্লাহর প্রাণ থাকতে পারে না। এই যুক্তির ফলেই একজন নাস্তিকতায় উপনীত হয়। কিন্তু এটা শুধু শব্দের মারপ্যাঁচের মাধ্যমে সত্যের অপব্যাখ্যা) কারণ আল্লাহ নিজেকে জীবন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, সুতরাং যুক্তিবাদী বিচার অনুযায়ী স্রষ্টা নিষ্প্রাণ এবং অস্তিত্বহীন নয়। প্রকৃত ব্যাপার হ’ল আল্লাহর গুণাবলীর সঙ্গে মানুষের সাদৃশ্য শুধুমাত্র নামে, মাত্রায় নয়। যখন স্রষ্টাকে উদ্দেশ্য করে গুণাবলি ব্যবহৃত হয় তখন সেগুলি সার্বভৌম অর্থে গ্রহণ করতে হবে এবং বুঝতে হবে সে সেগুলি মানব সুলভ অসম্পুর্ণতা মুক্ত।

২) তাওহীদ আল্-আছ্মা ওয়াস-সিফাত এর দ্বিতীয় রূপ হ’ল আল্লাহর উপর কোন নতুন নাম ও গুণাবলী আরোপ না করে তিনি নিজেকে যেভাবে উলেখ করেছেন সেভাবেই তাঁকে উলেখ করা। উদাহরণস্বরূপ, যদিও তিনি বলেছেন যে তিনি রাগ করেন তথাপি তাঁর নাম আল্-গাদিব (রাগী জন) দেয়া যাবে না কারণ আল্লাহ বা তাঁর রাসুল (সাঃ) কেউ এই নাম ব্যবহার করেননি। এটা একটি ক্ষুদ্র বিষয় মনে হতে পারে,কিন্তু আল্লাহর অসত্য বা ভূল বর্ণনা রোধ করার জন্য তৌহিদ আল্-আছ্মা ওয়াছ-ছিফাত অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ সসীম মানুষের পক্ষে কখনোই অসীম স্রষ্টার সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়।

৩) তাওহীদ আল্-আছ্মা ওয়াছ-ছিফাত এর তৃতীয় শর্ত অনুযায়ী আল্লাহকে কখনোই তাঁর সৃষ্টির গুণাবলি দেয়া যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, বাইবেল ও তৌরাতে দাবী করা হয় যে আল্লাহ ছয় দিনে বিশ্ব সৃষ্টি করেন এবং তারপর সপ্তম দিনে নিদ্রা যান। এই কারণে ইহুদি ও খৃষ্টানগণ হয় শনিবার নতুবা রবিবারকে বিশ্রামের দিন হিসাবে নেয় এবং ঐ দিন কাজ করাকে পাপ বলে গণ্য করে। এই ধরণের দাবী স্রষ্টার উপর তাঁর সৃষ্টির গুণাবলী আরোপ করে। মানুষই গুরুভার কাজের পর ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সবলতা পুনরুদ্ধারের জন্য তাদের ঘুমের প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে আল্লাহ কোরআনে পরিস্কারভাবে উল্লেখ করেছেন,
‘‘তাঁহাকে তন্দ্রা অথবা নিদ্রা স্পর্শ করে না।’’ (সূরা আল বাকারা ২ঃ২৫৫)
বাইবেল ও তৌরাতের অন্য জায়গায় উলেখ করা হয়েছে যে মানুষ যেমন তার ভূল উপলদ্ধি করে অনুতপ্ত হয় তেমনি স্রষ্টাও তাঁর খারাপ চিন্তার জন্য অনুতপ্ত হন।অনুরূপভাবে স্রষ্টা একটি আত্মা অথবা তাঁর একটি আত্মা আছে বলে দাবী করা তৌহিদ আল্-আছমা ওয়াছ ছিফাতকে সম্পুর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহ কোরআনের কোন জায়গায় নিজেকে আত্মা বলে উল্লেখ করেননি অথবা তাঁর রাসুল (সঃ) হাদিসে ঐ ধরণের কোন বক্তব্য প্রদান করেননি। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ আত্মাকে তাঁর সৃষ্টির একটি অংশ হিসাবে উলেখ করেছেন।আল্লাহর গুণাবলী উল্লেখ করতে কোরআনের আয়াতকে মৌলিক নিয়ম হিসাবে অনুসরণ করতে হবে,
“কোন কিছুই তাঁহার সদৃশ নহে, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শূরা ৪২ঃ ১১)

শ্রবণ ও দর্শন মানুষের গুণাবলী কিস্তু যখন স্রষ্টার উপর আরোপিত করা হয় তখন সেগুলি তুলনাবিহীন এবং ত্রুটিমুক্ত। যাহোক এই গুণাবলী মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চোখ ও কান অপরিহার্য, যা স্রষ্টার জন্য প্রযোজ্য নয়। স্রষ্টা সম্বন্ধে মানুষ কেবলমাত্র ততটুকুই জ্ঞাত যতটুকু তিনি তাঁর পয়গম্বরদের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। সুতরাং, মানুষ এই সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে অবস্থান করতে বাধ্য। মানুষ যদি স্রষ্টার বর্ণনা দিতে লাগামহীন বুদ্ধি প্রয়োগ করে তাহলে আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির গুণাবলীর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মত ভূলের সম্ভবনা থেকে যায়।
কল্পিত চিত্রের প্রতি আসক্তির কারণে খৃষ্টানরা মানুষ সদৃশ অগণিত চিত্র অঙ্কন, খোদাই এবং ঢালাই করে সেগুলিকে স্রষ্টার প্রতিচ্ছবি নাম দিয়েছে। এইগুলি জনগণের মধ্যে যিশুখৃষ্টের দেবত্বের স্বীকৃতি আদায় করতে সাহায্য করেছে। স্রষ্টা মানুষের মত, একবার এই কল্পনা গ্রহণযোগ্য হলে, যিশুখৃষ্টকে স্রষ্টা হিসাবে গ্রহণ করতে সত্যিকার কোন সমস্যা দেখা দেয় না।

৪) তাওহীদ আল্-আছ্মা ওয়াছ্-ছিফাতের চতুর্থ রূপের জন্য প্রয়োজন মানুষের উপর আল্লাহর গুণাবলী আরোপ না করা। যেমন, বাইবেলের নতুন সংস্করণে (Newtestament) পলকে (paul) তৌরাতে (Genesis 14:18-20)বর্ণিত সালেমের রাজা মেলচিজদেকের রূপে দেখান হয়েছে এবং তার ও যিশুখৃস্টের কোন আদি বা অন্ত নেই। এই বলে স্বর্গীয় গুণে গুণাম্বিত করা হয়েছেঃ

• “স্রষ্টার প্রধান পুরোহিত, সালেমের রাজা মেলচিজদেক রাজাদের বধ করার পর প্রত্যাগত আব্রাহামের সঙ্গে সাক্ষাত করলেন এবং তাকে আর্শীবাদ করলেন”;
• “এবং আব্রাহাম তাকে সব কিছুর এক দশমাংশ বিলি করে দিলেন। তাঁর নামের অর্থ হিসাবে তিনিই প্রথম ন্যয়নিষ্ঠার রাজা এবং সালেমেরও রাজা, অর্থাৎ শান্তির রাজা”
• “তিনি পিতা অথবা মাতা অথবা বংশ বৃত্তান্ত এবং আদি অন্তবিহীন; কিস্তু স্রষ্টার পুত্রের সদৃশ হয়ে চিরদিন পুরোহিত হিসাবে বহাল থাকবেন।”
• সুতরাং যিশুখৃস্টও নিজেকে প্রধান পুরোহিত পদে পদোন্নতি দেননি কিস্তু তাঁর দ্বারা নিয়োজিত হয়েছিলেন যিনি তাঁকে বললেন, “তুমি আমার পুত্র, আজ আমি তোমাকে জন্মদান করলাম;”
• যেমন তিনি অন্যখানেও বলেন,“মেলচিজদেকের পরে তুমি চিরদিনের জন্য পুরোহিত”।বেশীর ভাগ শিয়া সম্প্রাদায় (ইয়েমেনের যাইদাইদরা ছাড়া) তাদের ইমামগণকে সম্পুর্ণভাবে ভূলভ্রান্তির উর্দ্ধে (মাসুম),অতীত,ভবিষ্যত ও অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞানী,ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম এবং সৃষ্টির অনুপরমাণু নিয়ন্ত্রণকারী।

৫) আল্লাহর নামের এককত্ব বজায় রাখার আরও অর্থ হ’ল যদি নামে আগে আব্দ’ (অর্থ ভৃত্য অথবা বান্দা) সংযোজিত না করা হয় তাহলে তার সৃষ্টিকে আল্লাহর কোন নামে নামকরণ করা যাবে না। কিস্তু ‘রাউফ’ এবং ‘রহিম’ এর মত বহু স্বর্গীয় নাম মানুষের নাম হিসাবে অনুমোদিত কারণ রাসুল (সঃ) কে উল্লেখ করতে যেয়ে আল্লাহ এই ধরনের কিছু নাম ব্যবহার করেছেন। হিসাবে স্বর্গীয় গুণে গুনাম্বিত করেছে। এঁটা করতে যেয়ে তারা সেই সব প্রতিদ্বন্দ্বী সৃষ্টি করেছে যারা স্রষ্টার অদ্বিতীয় গুণাবলির অংশীদার এবং আল্লাহর সমসাময়িক।

“তোমাদিগের মধ্যে হইতেই তোমাদিগের নিকট এক রাসুল আসিয়াছে। তোমাদিগকে যাহা বিপন্ন করে উহা তাঁহার জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদিগের মঙ্গলকামী,মু’মিনদের প্রতি সে দরদী (রাউফ) ও পরম দয়ালু (রহিম)।” (সূরা আত্-তওবা ৯ঃ ১২৮)

কিস্তু ‘আর-রাউফ’ (যিনি সবচেয়ে সমবেদনায় ভরপুর) এবং ‘আর রহিম’ (সবচেয়ে ক্ষমাশীল) মানুষের ব্যাপারে তখনই ব্যবহার করা যাবে যখন নামের আগে আবদ ব্যবহার করা হবে, যেমন আব্দুর-রাউফ অথবা আব্দুর রহিম। আর-রাউফ এবং আর রহিম এমন এক পূর্ণতার প্রতিনিধিত্ব করে যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। তেমনিভাবে,আব্দুর-রাসূল (বার্তাবাহকের গোলাম), আব্দুন-নবী (রাসুলের গোলাম), আব্দুল-হুসাইন (হুসাইনের গোলাম) ইত্যাদি নামগুলি নিষিদ্ধ, কারণ এখানে মানুষ নিজেদেরকে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের গোলাম হিসাবে ঘোষণা করেছে। এই মতবাদের ভিত্তিতে, রাসুল (সঃ) মুসলিমদের তাদের অধীনস্থদের ‘আবদী’ (আমার গোলাম) অথবা ‘আমাতী’ (আমার বাঁদী) বলে উলেখ করতে নিষেধ করেছেন।তাওহীদ আল্-ইবাদাহ্ (আল্লাহর ইবাদতের এককত্ব বজায় রাখা) প্রথম দুই শ্রেণীর তাওহীদের ব্যাপক গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা থাকলেও শুধুমাত্র সেগুলির উপর দৃঢ় বিশ্বাসই তৌহিদের ইসলামী প্রয়োজনীয়তা পরিপূরণে যথেষ্ট নয়। ইসলামী মতে তৌহিদকে পরিপূর্ণতা দেয়ার জন্য তৌহিদ আর-রবুবিয়াহ এবং আল্-আছমা ওয়াছ-ছিফাত অবশ্যই এদের পরিপূরক তৌহিদ আল্-ইবাদাহ্-র সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। এই বিষয়টি যে ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত তা’হল আল্লাহ নিজেই পরিস্কার ভাষায় উলেখ করেছেন যে রাসুলের সময়কার মুশরিকণ (পৌত্তলিকণ) তৌহিদের প্রথম দুই শ্রেণীর বহু বিষয় সত্য বলে স্বীকার করেছিল। কোরআনে আল্লাহ রাসুল (সঃ)-কে পৌত্তলিকদের বলতে বলেছেন,

“বল কে তোমাদিগকে আকাশ ও পৃথিবী হইতে জীবনোপকরণ সরবরাহ করে অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কাহার কর্তৃত্বাধীন, কে জীবিতকে মৃত হইতে নির্গত করে এবং কে মৃতকে জীবিত হইতে নির্গত করে এবং কে সকল বিষয় নিয়ন্ত্রিত করে? তখন তাহারা বলিবে, আল্লাহ”। (সুরা ইউনুছ ১০: ৩১)

“যদি তুমি উহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর,কে উহাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছে, উহারা অবশ্যই বলিবে, ‘আল্লাহ’।” (সুরা আয-যুখরুফ ৪৩ঃ ৮৭)

“যদি তুমি উহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর, ভুমি মৃত হইবার পর আকাশ হইতে বারি বর্ষণ করিয়া কে উহাকে সঞ্জীবিত করে? উহারা অবশ্যই বলিবে, ‘আল্লাহ’।” (সুরা আল-আনকাবুত ২৯: ৬৩)

মক্কার পৌত্তলিকরা সবাই জানতো যে আল্লাহ হ’ল তাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, তাদের প্রভু এবং মালিক তবুও আল্লাহর কাছে ঐ জ্ঞান তাদের মুসলিম বানাতে পারেনি। আল্লাহ বলেছেনঃ “তাহাদিগের অধিকাংশ আল্লাহ বিশ্বাস করে কিন্তু তাঁহাকে শরীক করিয়া।” (সুরা ইউসুফ ১২: ১০৬)

এই আয়াতের উপর, মুজাহিদের ভাষ্য হলঃ আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের প্রতিপালন করেন এবং আমাদের জীবন নেন এই বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের ঘোষণা তাদেরকে আল্লাহর পাশাপাশি অন্যান্য দেব দেবতার উপাসনা হতে বিরত করেনি।
পূর্বে উল্লেখকৃত আয়াতে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কাফেররা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, রাজত্ব ও ক্ষমতা সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিল। প্রকৃতপক্ষে, ভীষণ প্রয়োজন এবং দুর্যোগের সময় তারা বিশ্বস্ততার সঙ্গে হজ্জ, দান, পশু বলি, মানত এমনকি উপাসনাও করত। এমনকি তারা ইব্রাহিমের ধর্ম অনুসরণ করছে বলেও দাবি করত। ঐ ধরণের দাবীর কারণে আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করলেনঃ

“ইব্রাহিম ইয়াহুদীও ছিল না, খৃস্টানও ছিল না,সে ছিল একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী এবং সে মুশরিকদের অস্তুর্ভুক্ত ছিল না।” (সুরা আল-ইমরান ৩ঃ৬৭)

কিছু পৌত্তলিক মক্কাবাসী এমনকি পুনরুত্থান, শেষ বিচার এবং পূর্ব নির্ধারিত ভাগ্য (কদর) বিশ্বাস করত। প্রাক-ইসলামী কবিতায় তাদের এই বিশ্বাসের প্রচুর সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন, কবি যুহাইর বলেছিলেনঃ

“হয় ইহা স্থগিত করা হয়েছিল, একটি পুস্তকে রক্ষিত হইয়াছিল এবং শেষ বিচার দিনের জন্য রক্ষা করা হয়েছিল নতুবা ত্বরাম্বিত করা হয়েছিল এবং প্রতিশোধ লওয়া হইয়াছিল।”

আন্তারা বলেছেন বলে উদ্ধৃত আছেঃ
“ওহে এবিল মৃত্যু হইতে তুমি কোথায় পালাইয়া যাইবে, যদি আসমানস্থিত আমার স্রষ্টা তোমার ভাগ্যে তা লিখিয়া থাকে?”

মক্কাবাসীরে তৌহিদ সম্পর্কে স্বীকারোক্তি এবং আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা সত্বেও একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি তারা অন্যান্য দেবদেবীর উপাসনা করার কারণে আল্লাহ তাদেরকে নাস্তিক (কাফের) এবং পৌত্তলিক (মুশরিক) হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন।

ফলে তৌহিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হ’ল তৌহিদ আল-ইবাদাহ অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতে এককত্ব বজায় রাখা। যেহেতু একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত প্রাপ্য এবং মানুষের ইবাদতের ফল হিসাবে একমাত্র তিনিই মঙ্গল মঞ্জুরী করতে পারেন,সেজন্য সকল প্রকার ইবাদত একমাত্র আল্লাহকে উদ্দেশ্য করেই করতে হবে। অধিকস্তু, মানুষ এবং স্রষ্টার মধ্যে যে কোন ধরণের মধ্যস্থতাকারী অথবা যোগাযোগকারীর প্রয়োজন নেই। আল্লাহ একমাত্র তাঁকে উদ্দেশ্য করেই ইবাদতের গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং এটাই সকল পয়গম্বর কর্তৃক প্রচারিত বার্তার সারমর্ম। আল্লাহ বলেছেন-

“আমি সৃষ্টি করিয়াছি জিন এবং মানুষকে এই জন্য যে,তাহারা আমারই ইবাদত করিবে।” (সুরা আয-যারিয়াত ৫১: ৫৬)

“আল্লাহর ইবাদত করিবার ও তাগুতকে (মিথ্যা দেবদেবীকে) বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসুল পাঠাইয়াছি।” (সুরা আন-নাহল ১৬: ৩৬)

সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পুর্ণভাবে উপলদ্ধি করা মানুষের সহজাত ক্ষমতার উর্দ্ধে। মানুষ একটি সসীম সৃষ্টিকর্ম এবং তার নিকট হতে অসীম স্রষ্টার ক্রিয়াকান্ড সম্পুর্ণ যুক্তিসঙ্গতভাবে উপলদ্ধি আশা করা যায় না। এই কারণে স্রষ্টা তাঁকে ইবাদত করা মানুষের স্বভাবের একটি অংশ হিসাবে তৈরি করেছেন। সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্বন্ধে পরিস্কার করে বুঝানোর জন্য তিনি পয়গম্বারদের এবং মানসিক ক্ষমতার বোধগম্য কিতাবসমূহ প্রেরণ করেছিলেন। স্রষ্টার ইবাদত (ইবাদাহ) করা উদ্দেশ্য এবং পয়গম্বারদের প্রার্থনা বার্তা ছিল একমাত্র সৃষ্টাকে ইবাদত করা, তৌহিদ আল ইবাদাহ। এর কারণে আল্লাহ ছাড়া অথবা আল্লাহ সহ অন্যকে ইবাদত করা কঠিন গুনাহ, র্শিক। যে সূরা আল ফাতিহা, মুসলিম নরনারীদের নামাজে প্রতিদিন অন্ততপক্ষে সতেরবার পড়তে হয় সেই সূরার চতুর্থ আয়াত উল্লেখ করে ‘‘আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমার কাছেই আমবা সাহায্য চাই।’’ এই বিবৃতি থেকে পরিস্কার হয়ে যায়, সকল প্রকার ইবাদত আল্লাহকে উদ্ধেশ্য করে করতে হবে যিনি সাড়া দিতে পারেন।

রাসূল (সাঃ) এককত্বের দর্শন দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে বলেছেনঃ তুমি যদি ইবাদতে কিছু চাও তাহলে শুধু আল্লাহর নিকট চাও এবং তুমি যদি সাহায্য চাও তাহলে শুধু আল্লাহর নিকট চাও’’ প্রয়োজনীয় এবং আল্লাহর নিকটবর্তীতা আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশ পায়
কোরআনের বহু আয়াতে। উদাহরনস্বরূপঃ

“আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্বন্ধে আপনাকে প্রশ্ন করে, আমি তো নিকটেই। আহবানকারী যখন আমাকে আহ্ন করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই। সুতরাং তাহারও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমাতে বিশ্বাস স্থাপন করক যাহাতে তাহারা ঠিক পথে চলিতে পারে।” (সূরা আল বাকারা ২: ১৮৬)

“আমিই মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছি এবং তাহার প্রবৃত্তি তাহাকে কুমন্ত্রনা দেয় তাহা আমি জানি। আমি তাহার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষা ও নিকটতম। ” (সূরা কাফ ৫০: ১৬)

তৌহিদ আল ইবাদাহ এর স্বীকৃতি,বিপরীত ভাবে সকল প্রকার মধ্যস্থতাকারী অথবা আল্লাহর সঙ্গে অংশীদারের সম্পৃক্ততার অস্বীকৃতি অপরিহার্য করে তোলে। যদি কেউ জীবিত ব্যক্তিদের জীবনের উপর অথবা যারা মারা গিয়েছে তাদের আত্মার উপর প্রভাব বিস্তারের জন্য মৃত্যের কাছে প্রার্থনা করে, তারা আল্লাহর সঙ্গে একজন অংশীদার যুক্ত করে। এই ধরণের প্রার্থনা আল্লাহর পাশাপাশি অন্যের উপাসনা করার মত। রাসূল (সঃ) সুস্পষ্টভাবে বলেছেনঃ “প্রার্থনাই ইবাদত” যদি কেউ রাসূল (সাঃ) অথবা তথকথিত আউলিয়া,জিন অথবা ফেরেশতাগণের নিকট সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করে অথবা প্রার্থনাকারীর পক্ষ হয়ে তাদেরকে সাহায্য করতে অনুরোধ করে তাহলে তারাও র্শিক করে। মূর্খ লোকেরা যখন আব্দুল কাদের জিলানীকে এবং আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ট এবং মহিমান্বিত বলেছেনঃ

“আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদত কর না যাহা তোমাদিগের কোন উপকার করিতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না।” (সূরা আল আম্বিয়া ২১: ৬৬)

“আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যাহাদিগকে আহবান কর তাহারা তো তোমাদিগেরই মত বান্দা।”(সূরা আল আরাফ ৭: ১৯৪)

যদি কেউ রাসূল (সাঃ) অথবা তথকথিত আউলিয়া, জিন অথবা ফেরেশতাগণের নিকট সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করে অথবা প্রার্থনাকারীর পক্ষ হয়ে তাদেরকে সাহায্য করতে অনুরোধ করে তাহলে তারাও র্শিক করে। মূর্খ লোকেরা যখন আব্দুল কাদের জিলানীকে গাওছি আজম উপাধীতে ভূষিত করে তখন তৌহিদের এই নিয়মে র্শিক করে। উপাধিটির আক্ষরিক অর্থ, মুক্তি প্রাপ্তির প্রধান উৎস; এমন একজন যিনি বিপদ হতে রক্ষা করার চেয়ে সবচেয়ে উপযুক্ত অথচ এই ধরণের বর্ণনা শুধু মাত্র আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য। দূর্ঘটনা ঘটলে কেউ কেউ আবদুল কাদিরেকে এই উপাধিতে ডেকে তাঁর সাহায্য এবং আত্মরক্ষা কামনা করে, যদিও আল্লাহ আগেই বলেছেনঃ

“আল্লাহ তোমাকে ক্লেশ দান করলে তিনি ব্যতীত উহা মোচনকারী আর কেহ নাই।” (সূরা আল-আন্আম ৬: ১৭)

কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, যখন মক্কাবাসিদের তাদের মূর্তিপূজার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হলে তারা উত্তর দিলঃ

“আমরা তাদের ইবাদত করি যাহাতে তাহারা আমাদিগকে আল্লাহর কাছাকাছি পৌছায়।” (সূরা আয্-যুমার ৩৯: ৩)

মূর্তিগুলিকে শুধুমাত্র মধ্যস্থতাকারী হিসাবে ব্যবহার করলেও আল্লাহ তাদের আচার অনুষ্ঠানের কারণে তাদের পৌত্তলিক বলেছেন। মুসলিমদের মধ্যে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ইবাদত করার প্রতি জোর দেয় তারা ভাল ভাবে এ বিষযে চিন্তা করে দেখতে পারেন।

তার্সাস নগরীর সলের (পরবর্তীকালে যাকে পল বলা হত) শিক্ষায় প্রভাবাম্বিত হয়ে খৃস্টানগণ পয়গম্বর যিশুখৃস্টের উপর দেবত্ব আরোপ করেছিল এবং তারা যিশুখৃষ্ট ও তাঁর মাতাকে উপাসনা করত। খৃস্টানদের মধ্যে ক্যাথোলিকদের প্রতিটি উপলক্ষের জন্য কিছু সাধু আছে। ক্যাথোলিকরা সাধুদের কাছে সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই প্রার্থনা করে যে এই সব সাধুরা জাগতিক ঘটনাবলিতে সরাসরিভাবে প্রভাব ফেলতে সক্ষম। ক্যাথলিকরা তাদের পুরোহিতদের আল্লাহ এবং তাদের নিজেদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসাবেও ব্যবহার করে। তারা বিশ্বাস করে যে এইসব পুরোহিতদের কৌমার্য ও ধর্মানুরাগের কারণে আল্লাহ কর্তৃক তাদের কথা শুনার সম্ভবনা বেশী। মধ্যস্থতাকারী সম্বন্ধে বিকৃত বিশ্বাসের কারণে শিয়া সম্প্রাদায়ের বেশীর ভাগ লোক সপ্তাহের কয়েকটি দিন এবং দিনের কয়েক ঘন্টা আলী,ফাতেমা,হাসান এবং হোসেন- এর প্রতি প্রার্থনার জন্য নির্ধারিত রেখেছে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ইবাদতে (ইবাদাহ্) শুধু রোজা রাখা, যাকাত প্রদান, হজ্জ এবং পশু কোরবানী করা ছাড়াও অনেক কিছু অন্তুর্ভূক্ত। এর মধ্যে ভালবাসা, বিশ্বাস এবং ভয়ের মত আবেগ অন্তর্ভুক্ত, যেগুলির বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে এবং যা শুধুমাত্র স্রষ্টার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হতে হবে। আল্লাহ এই সব আবেগের বাড়াবাড়ি সম্বন্ধে সাবধান করে দিয়ে উলেখ করেছেনঃ

“তথাপি কেহ কেহ আল্লাহ ছাড়া অপরকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাহাদিগকে
ভালবাসে; কিস্তু যাহারা ঈমান আনিয়াছে আল্লাহর প্রতি তাহাদের ভালবাসা দৃঢ়তম।” (সূরা আল-বাকারা ২ :১৬৫)
“তোমরা কি সেই সম্প্রদায়ের সহিত যুদ্ধ করিবে না, যাহারা নিজেদিগকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিয়াছে ও রাসুলের বহিষ্করণের জন্য সংকল্প করিয়াছে? উহারাই প্রথম তোমাদিগের বিরুদ্ধাচারণ করিয়াছে। তোমরা কি তাহাদিগকে ভয় কর? মুমিন হইলে আল্লাহকে ভয় করাই তোমাদের পক্ষে সমীচীন।” (সুরা আত্-তাওবা ৯: ১৩)
“আর তোমরা মুমিন হইলে আল্লাহর উপরেই নির্ভর কর।” (সুরা আল্-মায়েদা, ৫: ২৩)

ইবাদত (ইবাদাহ্) শব্দের অর্থ সম্পুর্ণভাবে আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহকে চুড়ান্ত আইন প্রণেতা হিসাবে গণ্য করা। কাজেই স্বর্গীয় আইনের (শারীয়াহ) উপর ভিত্তি না করে ধর্মনিরপেক্ষ আইন বিধান বাস্তবায়ন স্বর্গীয় আইনের প্রতি অবিশ্বাস এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করার পর্যায়ে পড়ে। এই ধরনের বিশ্বাস আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের উপাসনা করার নামান্তর (শির্ক)। আল্লাহ কোরআনে উলেখ করেছেনঃ

“আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তদানুসারে যাহারা বিধান দেয় না, তাহারাই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী (কাফিরুন)।”(সুরা আল-মায়েদা ৫: ৪৪)।

সাহাবী আদি ইবনে হাতিম, যিনি খৃস্টান ধর্ম হতে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, রাসুল (সাঃ) কে কোরআনের আয়াত পড়তে শুনেন “তাহারা আল্লাহ ব্যতীত তাহাদিগের পন্ডিতগণকে ও সংসার-ত্যাগীগণকে তাহাদিগের প্রভু (আরবাব) রূপে গ্রহণ করিয়াছে।” (সুরা আত্-তওবা ৯:৩১)

তিনি রাসুল (সাঃ) কে বললেন,“নিশ্চয়ই আমরা তাদের উপসনা করি না।” রাসূল (সঃ) তার দিকে তাকিয়ে বললেন “আল্লাহ যা কিছু হালাল করেছেন তারা কি তা হারাম ঘোষনা করেনি এবং তোমরা সকলে তা হারাম করনি এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা কি তারা হালাল করেনি এবং তোমরা সকলে তা হালাল করনি?” তিনি উত্তরে বললেন নিশ্চয়ই আমরা তা করেছি। রাসূল (সঃ) তখন উত্তর দিলেন, “ঐ ভাবেই তোমরা তাদের উপসনা করেছিলে।”(আত তিরমিজি কর্তৃক সংগৃহীত)

অতএব তাওহীদ আল ইবাদাহ এর একটি উলেখযোগ্য অংশ হল শরীয়াহ বাস্তবায়ন, বিশেষ করে যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা মুসলিম। বহু তথাকথিত মুসলমান দেশ, যেখানে সরকার আমদানীকৃত গনতান্ত্রিক অথবা সমাজতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত এবং যেখানে স্বর্গীয় আইন সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত অথবা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে ইসলামি আইন চালু করতে হবে। অনুরূপভাবে মুসলিম দেশ সমূহ যেখানে ইসলামি আইনকানুন চালু রয়েছে সেখানেও শরীয়াহ আইনকানুন প্রবর্তন করতে হবে কারণ জীবনের সকল ক্ষেত্রে এই আইনকানুন সম্পর্কযুক্ত। মুসলিম দেশে শরীয়াহ আইনের পরিবর্তে অনৈসলামিক আইনকানুনের স্বীকৃতি হল র্শিক এবং এটা একটি কুফরী কাজ। যাদের ক্ষমতা আছে তাদের অবশ্যই এই অনৈসলামিক আইনকানুন পরিবর্তন করা উচিত। যাদের সে ক্ষমতা নেই তাদের অবশ্যই কুফর এর বিরুদ্ধে এবং শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের জন্য সোচ্চার হওয়া উচিত। যদি এটাও সম্ভব না হয়, তাহলে আল্লাহর সস্তুষ্টি ও তৌহিদ সমুন্নত রাখার জন্য অনৈসলামিক সরকারকে আন্তরিকভাবে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করতে হবে। জেনে রাখা প্রয়োজন যে আল্লাহ একক ইলাহ হিসেবে নিম্নের ইবাদতগুলি একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য। ইবাদতের প্রকার সমূহ যা আল্লাহ তাআ’লা নির্দেশিত করেছেন তা হচ্ছেঃ

(ক)(আল- ইসলাম)- আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সমর্পণ করা।
(খ)(আল-ঈমান)- বিশ্বাস স্থাপন করা।
(গ)(আল-ইহসান)-নিষ্ঠার সাথে কাজ করা। দয়া-দাক্ষিণ্য ও সহানুভূতি প্রদর্শন, উপকার সাধন করা।
(ঘ)(আদ-দো’য়া) প্রার্থনা, আহবান করা।
(ঙ)(আল-খাওফ) ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা ।
(চ)(আর-রাজা) আশা-আকাংখা করা ।
(ছ)(আত্-তাওয়াক্কুল) নির্ভরশীলতা, ভরসা করা ।
(জ)(আর-রাগ্বাহ) অনুরাগ, আগ্রহ।
(ঝ)(আর-রাহ্বাহ) ভয় ভীতি।
(ঞ)(আল-খূশূ) বিনয়-নম্রতা।
(ট) (আল-খাশিয়াত) অমংগলের আশংকা।
(ঠ) (আল- ইনাবাহ) আল্লাহর অভিমুখী হওয়া, তাঁর দিকে ফিরে আসা।
(ড)(আল-ইস্তে’আনাত) সাহায্য প্রার্থনা করা।
(ঢ) (আল-ইস্তে-আযা) আশ্রয় প্রার্থনা করা।
(ণ)(আল-ইস্তেগাসাহ) নিরুপায় ব্যাক্তির বিপদ উদ্ধারের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা।
(ত)(আয্-যাবাহ) আত্ব ত্যাগ বা কুরবানী করা।
(থ)(আন্-নযর) মান্নত করা।

এগুলি এবং অন্যান্য যে পদ্ধতি সমূহের আদেশ ও নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন সবকিছুই তাঁর সšত্তষ্টি বিধানের জন্যে। উপোরোল্লিখিত ইবাদতগুলির কোন একটি যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য নিবেদন করে তবে সে মুশরিকে পরিণত হবে।

আল কুরআনে ইলাহের পরিচয় –

কালেমা এর স্বীকৃতির মাধ্যমে আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ জন্য আমাদের ইলাহের পরিচয় জানা প্রয়োজন। আল কুরআনে সুষ্পষ্টভাবে হিসেবে আল্লাহর পরিচয় পাওয়া যায়।

সূরা বাক্বারা ২: ২৫৫ আয়াতটি আয়াতুল কুরসী নামে খ্যাত। সে আয়াতের প্রথমে বলা হয়েছে অর্থাৎ “আল্লাহ তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই” যিনি-

• “চিরঞ্জীব”, আল্লাহ ছাড়া আর এমন কেউই নেই যে চিরঞ্জীব কারণ প্রত্যেক প্রানীকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। অপরদিকে আল্লাহ “চির প্রতিষ্ঠিত” তিনি ছাড়া আর কেউই নেই যে চির প্রতিষ্ঠিত কারণ প্রত্যেক বস্তুই ধ্বংসশীল আর আল্লাহ হচ্ছেন অবিনশ্বর সত্ত্বা। যেহেতু আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ চিরঞ্জীব এবং চির প্রতিষ্ঠিত নয় সেহেতু আল্লাহ ছাড়া আর কেউ হবার যোগ্যতা রাখে না।
• অতঃপর বলা হয়েছে “তাঁকে তন্দ্রা এবং নিদ্রা স্পর্শ করে না”। আল্লাহর তো ঘুম আসেই না এমনকি ঘুমের যে ঝিমুনি ভাব সেটাও আসে না, তিনি এসব দূর্বলতা থেকে মুক্ত। কারণ যিনি ইলাহ তিনি যদি এসব দূর্বলতা থেকে মুক্ত না হতেন তবে তো আসমান-যমীন সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যেত। অথচ সৃষ্টির যত প্রানী আছে তারা কেউই এসব দূর্বলতা থেকে মুক্ত নয়, এজন্যই আল্লাহই একমাত্র যোগ্য ইলাহ।
• “আকাশ এবং পৃথিবীর সবকিছুই তাঁর”। এই আসমান-যমীন এবং এর মধ্যবর্তী যা কিছু আছে সবকিছুর একচ্ছত্র মালিকানা একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহ ছাড়া কেউই এ মালিকানা দাবী করতে পারে না, দাবী করার কোন অধিকারও নেই। এ কারণে তিনিই একমাত্র ইলাহ।
• “কে আছে এমন যে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ব্যতীত”। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এমন শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী যে তাঁর সামনে কেউ সুপারিশ করার অধিকার রাখে না, তিনি যাকে অনুমতি দেন সে ব্যতীত। এমনকি কোন নবীও আল্লাহর সামনে মুখ খোলার বা সুপারিশ করার অধিকার রাখেন না যতক্ষন না আল্লাহ তাদের অনুমতি দেবেন। আল্লাহ ছাড়া এমন মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব আর কারো নেই,এ জন্যই আল্লাহই একমাত্র ইলাহ।
• অতঃপর বলা হয়েছে “তাদের সম্মুখে এবং পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন।” আল্লাহই একমাত্র সত্ত্বা যিনি মানুষের অগ্র-পশ্চাত সবকিছুই জানেন, তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না। এ জন্যই আল্লাহ ব্যতীত কেউ ইলাহ হবার যোগ্য নয়।
• “যা তিনি ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত তাঁর জ্ঞান ভান্ডার থেকে কিছুই তারা আয়ত্ব করতে পারে না।” আল্লাহ হচ্ছেন পরিপূর্ণ জ্ঞানী, তিনি সৃষ্টি জীবকে দয়া করে যতটুকু জ্ঞান দিয়েছেন সেটুকু জ্ঞানই সৃষ্টির আছে। সুতরাং সৃষ্টির মধ্যে যতকিছু আছে সবাই হচ্ছে অপূর্ণাঙ্গ জ্ঞানী, আবার এ সামান্য জ্ঞানটুকুও আল্লাহর দেয়া। সুতরাং আল্লাহ পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী বলেই তিনি আমাদের একমাত্র ইলাহ,তিনি ছাড়া আর কেউ ইলাহ হতে পারে না।
• “তাঁর কুরসী আকাশ এবং পৃথিবীময় পরিব্যাপ্ত”। আল্লাহর ‘কুরসী’ আকাশ এবং পৃথিবীকে পরিবেষ্টন করে আছে।
• “এদের (আকাশ এবং পৃথিবীর) রক্ষনা-বেক্ষনে তাঁকে ক্লান্ত করে না।” আল্লাহই একমাত্র সত্ত্বা যিনি আসমান-যমীন এবং এর মধ্যবর্তী যা কিছু আছে সবকিছুর রক্ষণাবেক্ষণ করছেন অন্যথায় সবকিছু মূহুর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেত। আর এসব কিছুর রক্ষণাবেক্ষণে আল্লাহকে বিন্দু মাত্র ক্লান্ত করে না। তিনি যাবতীয় দূর্বলতা-অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত এবং পবিত্র। এ জন্যই আল্লাহই একমাত্র ইলাহ।

সবশেষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন- “আর তিনি মহান,শ্রেষ্ঠ।” উপরে উল্লেখিত গুনাবলীগুলোর অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। তিনি ব্যতীত আর কেউই এরূপ শ্রেষ্ঠত্ব এবং কর্তৃত্বের অধিকারী নেই। এ কারণে আল্লাহই আমাদের একমাত্র ইলাহ তনি ব্যতীত আর কেউ ইলাহ নেই,হওয়ার যোগ্য নয়,হতে পারে না।
আল্ কুরআনে অপর এক আয়াতে ইলাহ হিসেবে আল্লাহর পরিচয় পাওয়া যায়ঃ
“তিনিই আল্লাহ তা’আলা, তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই; তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যকে জানেন তিনি পরম দয়ালু, অসীম দাতা।তিনিই আল্লাহ তিনি ব্যতিত কোন উপাস্য নেই। তিনিই একমাত্র মালিক, পবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা, আশ্রয়দাতা, পরাক্রান্ত, প্রতাপান্বিত, মাহাত্নশীল। তারা যাকে অংশীদার করে আল্লাহ তা’ আলা তা থেকে পবিত্র।তিনিই আল্লাহ তা’আলা, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, রূপদাতা, উত্তম নাম সমূহ তাঁরই। নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে, সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়।[৫৯ঃ২২-২৪]”
আল্লাহই একমাত্র ইলাহ আল-কুরআনে এ ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ-

১ম চ্যালেঞ্জঃ “বল তো কে সৃষ্টি করেছেন নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্যে বর্ষণ করেছেন পানি; অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম বাগান সৃষ্টি করেছি। তার বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার শক্তিই তোমাদের নেই। অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বরং তারা সত্যবিচ্যুত সম্প্রদায়।” (সূরা, নামল ২৭: ৬০)
২য় চ্যালেঞ্জঃ
“বল তো কে পৃথিবীকে বাসোপযোগী করেছেন এবং তার মাঝে মাঝে নদ-নদী প্রবাহিত করেছেন এবং তাকে স্থিত রাখার জন্যে পর্বত স্থাপন করেছেন এবং দুই সমুদ্রের মাঝখানে অন্তরায় রেখেছেন। অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।” (সূরা, নামল ২৭: ৬১)
৩য় চ্যালেঞ্জঃ
“বল তো কে নিঃসহায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে পুর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত করেন। সুতরাং আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই ধ্যান কর। ”(সূরা, নামল ২৭:৬২)
৪র্থ চ্যালেঞ্জঃ
“বল তো কে তোমাদেরকে জলে ও স্থলে অন্ধকারে পথ দেখান এবং যিনি তাঁর অনুগ্রহের পূর্বে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন? অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তারা যাকে শরীক করে, আল্লাহ তা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।” (সূরা নামল ২৭:৬৩)
৫ম চ্যালেঞ্জঃ
“বল তো কে প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তাকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন এবং কে তোমাদেরকে আকাশ ও মর্ত্য থেকে রিযিক দান করেন। সুতরাং আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বলুন, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর।” (সূরা নামল ২৭:৬৪)
৬ষ্ঠ চ্যালেঞ্জঃ
“তিনিই আল্লাহ তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। ইহকাল ও পরকালে তাঁরই প্রশংসা। বিধান তাঁরই ক্ষমতাধীন এবং তোমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।বলুন, ভেবে দেখ তো, আল্লাহ যদি রাত্রিকে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, তবে আল্লাহ ব্যতীত এমন উপাস্য কে আছে, যে তোমাদেরকে আলোক দান করতে পারে? তোমরা কি তবুও কর্ণপাত করবে না ? বলুন, ভেবে দেখ তো, আল্লাহ যদি দিনকে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, তবে আল্লাহ ব্যতীত এমন উপাস্য কে আছে যে, তোমাদেরকে রাত্রি দান করতে পারে, যাতে তোমরা বিশ্রাম করবে? তোমরা কি তবুও ভেবে দেখবে না ?” (সূরা, কাসাস ২৮: ৭০-৭২)

“তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সুর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে একই ব্যক্তি থেকে। অতঃপর তা থেকে তার যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তোমাদের জন্যে আট প্রকার চতুষ্পদ জন্তু অবতীর্ণ করেছেন। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভে পর্যায়ক্রমে একের পর এক ত্রিবিধ অন্ধকারে। তিনি আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা, সাম্রাজ্য তাঁরই। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। অতএব, তোমরা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছ? ” (সূরা যূমার ৩৯:৫-৬)

ইলাহ বনাম ক্ষমতা –

যে ব্যক্তি কাউকে সাহায্যকারী, অভাব পূরণকারী, দোয়া শ্রবনকারী, ভাল-মন্দ সাধনকারী বলে মনে করে, তার এমনটি মনে করার কারণ এই যে তার মতে ঐ ব্যক্তি বিশ্ব-জাহান পরিচালনায় কোন না কোন ক্ষমতার অধিকারী। অনুরূপভাবে কেউ যদি কোন ব্যক্তিকে ভয় করে এবং মনে করে যে তার অসন্তুষ্টি আমার ক্ষতির কারণ এবং সন্তুষ্টি কল্যানের কারণ। তার এ বিশ্বাস ও কর্মের কারণ এছাড়া আর কিছু নয় যে, তার মনে সে ব্যক্তির সম্মন্ধে এক ধরনের শক্তির ধারণা রয়েছে। অপরদিকে কোন ব্যক্তি মহান আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনকে স্বীকার করার সত্বেও এভাবে অন্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করে,তার এহেন কর্মের কারণ শুধু এই যে, সে অন্যকে কোন না কোনভাবে আল্লাহর সাথে অংশীদার বনিয়ে নেয় বা এরূপ অংশীদারিত্বের ধারণা করে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কারো নির্দেশকে আইন এবং অবশ্য পালনীয় মনে করে, সে তাকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী স্বীকার করে। সুতরাং উলুহিয়্যাতের অর্থাৎ ইলাহ হিসেবে আল্লাহর একত্বের প্রকৃত স্পিরিট হচ্ছে ক্ষমতা। প্রত্যেক বিষয়ে আল্লাহই একক এবং নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী। সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী তিনি একাই। আসমান-যমীনের সকল ক্ষমতা তাঁরই ইখতিয়ারে। সৃষ্টি করা, নিয়ামত দান করা, নির্দেশ দেয়া, শক্তি-সামর্থ সবকিছুই তাঁর হাতে নিহিত। সবকিছুই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাঁর আনুগত্য করছে। তিনি ছাড়া কারো কোন ক্ষমতা নেই, নেই নির্দেশ দানের অধিকার, সৃজন, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার রহস্য সম্পর্কেও কেউ অবগত নয়। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই, হবার যোগ্যতা রাখে না, হতে পারেনা। এ কারণেই আল-কুরআনে একক ইলাহ হিসেবে আল্লাহর নিরংকুশ ঘোষণাঃ

“আর তোমাদের উপাস্য একইমাত্র উপাস্য। তিনি ছাড়া মহা করুণাময় দয়ালু কেউ নেই।“(সূরা, বাক্বারা ২: ১৬৩)
“তিনিই উপাস্য নভোমন্ডলে এবং তিনিই উপাস্য ভুমন্ডলে। তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।” (সূরা, যুখরুফ ৪৩: ৮৪)
“যদি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলে আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য উপাস্য থাকত, তবে উভয়ের ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র।” (সূরা, আম্বিয়া ২১: ২২)
“তিনিই আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনিই সব কিছুর স্রষ্টা। অতএব, তোমরা তাঁরই এবাদত কর। তিনি প্রত্যেক বস্তুর কার্যনির্বাহী।“(সূরা, আনআম ৬: ১০২)

Advertisements
This entry was posted in ঈমান, তাওহীদ and tagged . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s