শিরক


শিরকের ভয়াবহতা
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ

“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক্ করবে না।” (সূরা, নিসা-৪:৩৬)
এ আলোচনায় আমরা তাওহীদ এর বিপরীত শিরক্ সম্পর্কে আলোচনা করেছি সেই সত্যানুসন্ধানীদের জন্য যারা বর্তমান জাহিলিয়্যাতের এ অন্ধকারে নিজে তাওহীদের চেতনা নিয়ে একজন মুসলিম হিসাবে বাঁচতে চান এবং পরিবার, সমাজ তথা আল্লাহর এ যমীন থেকে শিরকের কলুষ কালিমাকে মুছে দিয়ে তাওহীদের আলোয় আলোকিত করতে চান। আর আল্লাহর খলিফা হিসাবে এটাই আমাদের অন্যতম দায়িত্ব ।

শিরক পরিচিতিঃ
যেহেতু শিরক্ তাওহীদের সম্পূর্ণ বিপরীত কাজেই, শিরক্ সম্পর্কে জানতে হলে সর্বপ্রথম তাওহীদ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
তাওহীদ-
শুধু তাওহীদ বলতে তাওহীদে মুতলাক বা অবিভক্ত তাওহীদ কে বুঝায়। যার অর্থ- এককত্ব বা একত্বে ভূষিত করা। সালফে সালেহীনগণ তাওহীদকে বিভিন্ন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছেন।
১. তাওহীদ হল- কায়মনোবাক্যে এ সুদৃঢ় বিশ্বাস পোষন করা যে, সকল বিষয়েই আল্লাহ এক ও একক, অদ্বিতীয়, নিরুপম, সমকক্ষহীন, তুলনাহীন। তিনি ব্যক্তি সত্বা, কর্মরাজি, সুন্দর নামসমূহ ও গুনাবলী এবং ইবাদতের সার্বভৌম অধিকারে সম্পূর্ন এক ও একক। তেমনিভাবে তিনি একত্বের অধিকারী সৃষ্টিকর্মে ও নির্দেশদানে। (শরহুল আক্বিদাহ আত্ তাহাবিয়্যাহ)
২. তাওহীদ হচ্ছে- আল্লাহর লেশমাত্র দোষহীন পরিপূর্ন গুনরাজিতে আল্লাহর একত্বের হৃদয়গত ইলম ও বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি ও ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর একত্ব প্রতিষ্ঠা করা। (কিতাবুত তাওহীদ)
৩. তাওহীদ হচ্ছে- একমাত্র সত্য মা’বুদের জন্যে একমাত্র সত্য দ্বীন ও ঈমানের পথে একাভিমুখী বান্দাহ হয়ে যাওয়া। (ইবনুল কাইয়্যেম রহঃ)
৪. তাওহীদ হচ্ছে- ইবাদত তথা ইসতিয়ানাত তথা দাসত্ব ও সাহায্য প্রার্থনা একমাত্র আল্লাহর সাথে বিশেষিত করা। (কিতাবুত তাওহীদ লি ইবনে তাইমিয়্যাহ রহঃ)

শিরক্-

শিরক শব্দের আভিধানিক অর্থ- অংশীদারিত্ব, অংশীবাদ, মিলানো, সমকক্ষ করা, অংশীস্থির করা, সমান করা, ভাগাভাগি, সম্পৃক্ত করা। ইংরেজীতে Poytheism (একাধিক উপাস্যে বিশ্বাস), Sharer, Partner, Associate।
পারিভাষিক পরিচিতি-
• “শরীয়তের পরিভাষায় যেসব গুনাবলী কেবল আল্লাহ্র জন্য নির্ধারিত সেসব গুনে অন্য কাউকে গুনান্বিত ভাবা বা এতে অন্য কারো অংশ আছে বলে মনে করাই শিরক্।”
• “শিরক্ হচ্ছে বান্দাহ্র আল্লাহর সাথে তাঁর রুবুবিয়্যাত সংক্রান্ত কর্ম কিংবা তাঁর জাত ও আসমা ওয়াস সিফাতে তথা নাম ও গুনাবলী অথবা উলুহিয়্যাতে (ইবাদতে) কাউকে শরীক করা”। (মিরাসিল আম্বিয়া, পৃঃ ৮)
• শিরক্ হচ্ছে আল্লাহর সাথে এমন বিষয়ে সমকক্ষ স্থির করা যেটা আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। যেমন- আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করা, অন্য কারো নিকট আশা করা, আল্লাহর চাইতে অন্য কাউকে বেশী ভালবাসা, অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতের কোন একটি অন্যের দিকে সম্বোধন করাকে শিরক্ বলে।
• তাওহীদুল্লাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত মানুষের সকল বিশ্বাস, কথা ও কাজে আল্লাহর এককত্বের উপলব্দি ও মেনে চলা। পক্ষান্তরে শিরক্ হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
• ইমাম কুরতুবী বলেন, শিরক্ হল আল্লাহর নিরংকুশ প্রভূত্বে কারো অংশীদারিত্বের আক্বীদা পোষণ করা।
• আক্বীদার পরিভাষায়, শিরক্ হচ্ছে আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট ও সীমাবদ্ধ কোন বিষয় আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা।
• “শিরকের ক্ষেত্রে একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, এতে দু‘শরীকের অংশ সমান হওয়া আবশ্যক নয়। বরং শতভাগের একভাগের অংশীদার হলেও তাকে অংশীদার বলা হয়। তাই আল্লাহতা‘য়ালার হকের সামান্যতম অংশ অন্যকে দিলেই তা শিরকে পরিণত হবে।এতে আল্লাহর অংশটা যতই বড় রাখা হোক না কেন।”

শিরকের ভয়াবহতা
শিরকের পরিণাম ভয়াবহ। এটি মানুষের চুড়ান্ত ধ্বংস ডেকে আনে। আল কোরআন ও সহীহ হাদীস থেকে এর ভয়াবহতার স্বরূপ তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ্। শিরক্ সবচেয়ে বড় অপরাধ-বড় গুনাহ-
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শিরক চরম যুলম।” (সূরা, লুকমান ৩১:১৩)
ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন এক ব্যক্তি বলল,
“হে আল্লাহর রাসুল সবচেয়ে বড় গোনাহ কোনটি?” রাসুল(সঃ) বললেন, “আল্লাহর সাথে শরীক করা, অথচ আল্লাহই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (সহীহ বুখারী, মুসলিম)
শিরক্ এর অপরাধ/ গুনাহ আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন না-
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করেন না। এটি ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। এবং কেহ আল্লাহর শরীক্ করলে সে এক মহাপাপ আরোপ করে।” (সুরা, নিসা-৪:৪৮)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাঁর সাথে শরীক্ করা ক্ষমা করেন না। এটি ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। এবং কেহ আল্লাহর শরীক্ করলে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়।” (সুরা, নিসা-৪:১১৬)
জাবির বিন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, নবী (সঃ) বলেছেন- “বান্দার জন্য সর্বদাই ক্ষমা রয়েছে যতক্ষন পর্যন্ত হিযাব বা পর্দা পতিত না হয়।” বলা হলো, “হে আল্লাহর রাসুল! হিযাব বা পর্দা কি?” তিনি বললেন, “আল্লাহর সাথে শরীক্ করা।” (মুসনাদে আহমদ, ইবনু কাছীর ১ম খন্ড ৬৭৮পৃঃ)
শিরক্ করলে জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম অবধারিত-
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“হে বনী ইসরাইল! তোমরা আমার রব এবং তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত কর। কেউ আল্লাহর শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম।” (সূরা, মায়েদা-৫:৭২)
রাসুল (সঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক্ করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে জাহান্নামে যাবে।” (মুসলিম)
শিরক্ করলে সব আমল বাতিল হয়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়-
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই এই ওহী হয়েছে তুমি আল্লাহর সাথে শরীক্ করলে তোমার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং অবশ্য তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্থ।” (সূরা যুমার, ৩৯:৬৫)
সূরা আনফালের ৮৩-৮৭ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়লা ১৮ জন নবীর নাম নিয়ে তাদের ব্যাপারে বলেছেন-
“এটি আল্লাহর হেদায়েত, নিজ বান্দাহদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি এটি দ্বারা সৎপথে পরিচালিত করেন। তারা যদি শিরক্ করতো তবে তাদের কৃতকর্ম নিস্ফল হত।” (সূরা, আন‘আম-৬:৮৮)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়লা আরও বলেনঃ
“আমি তাদের আমলের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকনায় পরিণত করে দেব।” (সূরা, ফোরক্বান-২৫:২৩)
শিরককারী ধ্বংসে এবং বিপর্যয়ে পতিত হয়-
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“যে কেউ আল্লাহর শরীক করে সে যেন আকাশ থেকে পড়ল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।” (সূরা, হাজ্জ ২২:৩১)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা আরও বলেনঃ
“যারা আল্লাহর সাথে অপর ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে, সুতরাং শীঘ্রই ওরা (মুশরিকরা) এর পরিনতি জানতে পারবে।” (সূরা, হিজর ১৫ঃ৯৬)
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সঃ) থেকে বর্ণনা করেন, নবী (সঃ) বলেন- “তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বস্তু থেকে বেঁচে থাকবে।” সাহাবাগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল সেগুলো কি?” রাসুল (সঃ) বলেলেন, ‘‘আল্লাহর সাথে শরীক করা এবং যাদু———-।” (বুখারী ও মুসলিম)
শিরককারী মুশরিক অপবিত্র-তার জন্য দোয়া করা যাবে না, এরা সৃষ্টির অধম-
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“নিশ্চয়ই মুশরিকরা অপবিত্র।” (সূরা, তাওবাহ-৯:২৮)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী ও মু‘মিনদের সংগত নয়, এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী।” (সূরা, তাওবাহ ৯:১১৩)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা আরও বলেনঃ
“আহলে কিতাব ও মুশরিক কাফেররা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম।” (সূরা, বাইয়্যেনাহ ৯৮:৬)
শিরক্ করলে কাফের-মুশরিকে পরিণত হয়ে যায়-
ঈমান আনার পরেও কেউ যদি আল্লাহর সাথে শিরক্ করে তবে সে কাফের এবং মুশরিক হয়ে যায়। ইসলামী শরী‘য়া অনুযায়ী তাকে ‘মুর্তাদ’ বলা হয়। তার হুদুদ (শাস্তি) মৃত্যুদন্ড। রাসুল (সঃ) বললেন- “তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক ও সর্বনাশা গুনাহ থেকে বিরত থাক।’’ অত:পর শিরকের কথা বললেন। অত:পর বললেন- যে ব্যক্তি নিজের দ্বীনকে পরিবর্তন করে(অর্থাৎ ইসলামকে ত্যাগ করে) তাকে হত্যা কর।” (বুখারী, আহমাদ, কবীরা গুনাহ-বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার পৃঃ৭)
আল্লাহ সুবতানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“যদি তোমরা তাদের (মুশরিকদের) কথামত চল তবে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হবে।” (সূরা, আন‘আম ৬ঃ১২১)
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ সুবতানাহু ওয়াতা‘য়ালা মুসলিমদেরকে সাবধান করে দিয়েছেন যদি তারা মুশরিকদের আক্বীদা-বিশ্বাস, কাজ-কর্মে আনুগত্য করে তাহলে তারা মুশরিক হয়ে যাবে।

শিরকের ক্ষতিকর দিক এবং তার বিপদসমূহ
শিরকে অনেক অনিষ্টকর দিক আছে, ব্যক্তি জীবনে ও সমাজ জীবনে তার বিশেষত্বগুলোঃ
শিরক মানবতার জন্য অবমাননাকর-
মানুষের সম্মানকে ধূলায় লুন্ঠিত করে ও তার সামর্থ্যকে নিচু করে দেয়। তার মর্যাদাকেও নিচু করে দেয়, কারণ আল্লাহ পাক মানুষকে খলীফা হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন এবং তাকে সম্মানিত করেছেন এবং তাকে সমস্ত নাম শিখিয়েছেন। তার অনুগত করে দিয়েছেন; যা কিছু আছে আসমান ও যমীনে, তাকে এই জগতের সকলের উপর নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু সে তার অবস্থাকে ভুলে গেছে। ফলে সে এই জগতের কোন কোন জিনিসকেও ইলাহ ও মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে। তার কাছে নিজেকে ছোট করে এবং অপমানিত হয়। এর থেকে অসম্মানের বিষয় আর কি হতে পারে যা আজকে দেখা যাচ্ছে কোটি কোটি লোক হিন্দুস্তানে গাভীর পূজা করছে যাকে আল্লাহ পাক মানুষের খেদমতের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ঝাঁক ধরে বসে আছে। তাদের কাছে নিজেদের প্রয়োজন নিবেদন করছে। অথচ তারাও তাদের মতই আল্লাহ পাকের দাস। না নিজেদের জন্য তারা কোন উপকার করতে পারে; না ক্ষতি করতে পারে। দেখ, হোসেন (রাঃ) নিজেকে শহীদ হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি জীবিতাবস্থায়। তবে কেমন করে অপরের কষ্ট দূর করবেন এখন মৃত্যুর পর এবং ভালকে ডেকে আনবেন? মৃতরাই জীবিত মানুষের দোয়ার মুখাপেক্ষী। তাই আমরা তাদের জন্য দোয়া করি। আমরা যেন তাদের কাছে দোয়া না চাই আল্লাহকে ছেড়ে।
আল্লাহ পাক এই সম্বন্ধে বলেনঃ
অর্থাৎ, “যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে ডাকে তারা এতটুকুও জিনিস সৃষ্টি করে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে।মৃতরা কখনই জীবিতদের সমান নয় এবং তারা জানে না কখন তাদেরকে কবর থেকে উঠানো হবে।” (সুরা নহলঃ ২০)
এবং অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ
“যে আল্লাহ পাকের সাথে কোন শিরক করে, যেন সে আকাশ থেকে পড়ে গেছে এবং এক পাখি তাকে ঠোঁট দিয়ে নিয়েছে অথবা তাকে বাতাস বহু দূরে নিক্ষেপ করেছে।” (সুরা হজ্জঃ ৩১)

শিরকের কারণে সমস্ত আজেবাজে কুসংস্কার ও বাতিল মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে কারণ যে মনে করে এই জগতে আল্লাহ ছাড়া অন্যের প্রভাব আছে, যেমন নক্ষত্র, জ্বিন, নশ্বর, আত্মা ইত্যাদি, তার বুদ্ধি এমন হয়ে যায় যে, সে সমস্ত কুসংস্কারকে গ্রহণ করতে তৈরি হয়ে যায় এবং সমস্ত মিথ্যাবাদী দাজ্জালদের বিশ্বাস করতে শুরু করে। এভাবে সমাজের মধ্যে শিরক প্রবেশ করতে থাকে। জ্বিন বশকারী, গণক, যাদুকর, জ্যোতীষ এবং এই জাতীয় লোকেরা মিথ্যা দাবি করে যে, তারা ঐ ভবিষ্যৎ জানে যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। ফলে সমাজের মধ্যে আস্তে আস্তে আসবাব সংগ্রহের প্রচেষ্টা দূর্বল হয় এবং জগতের নিয়ম উল্টে যেতে থাকে।
শিরক সবচেয়ে বড় যুলুম-
সত্যিই এটা যুলুম। কারণ সবচেয়ে বড় সত্য হল আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই ও অন্য কোন প্রতিপালক নেই। তিনি ছাড়া কেউ আইন প্রণেতা নেই। কিন্তু মুশরিক আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে মাবুদ বানিয়ে নেয়। অন্যের কাছ থেকে আইন গ্রহণ করে এবং মুশরিক নিজের উপরও যুলুম করে। কারণ, মুশরিক তারই মত আরেকজন দাসের গোলাম হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ পাক তাকে স্বাধীনভাবে সৃষ্টি করেছেন। শিরক অপরের উপর যুলুম। কারণ, যে আল্লাহর সাথে অন্যকে শিরক করে সে তো অত্যাচার করল; কারণ এমন কাউকে সে হক্ দিল যার ঐ অধিকার নেই।
শিরক হচ্ছে সমস্ত কল্পনা ও ভয়ের মূল-
কারণ, যার মাথায় কুসংস্কার বাসা বাঁধতে শুরু করে এবং সমস্ত আজেবাজে কথা ও কাজকে গ্রহণ করতে থাকে, ফলে সমস্ত দিক হতেই সে ভয় পেতে শুরু করে। কারণ, সে নানা মাবুদের উপর ভরসা করতে শিখেছে। তাদের প্রত্যেকেই ভাল করতে অপারগ, এমনকি নিজেদের থেকেও তারা কষ্ট মুসিবত দুর করতে পারে না। ফলে যেখানে শিরক চলতে থাকে সেখানে নানা ধরনের কুসংস্কার ও ভয় প্রকাশ পেতে থাকে কোন প্রকাশ্য কারণ ছাড়াই। আল্লাহ পাক এই সম্বন্ধে বলেনঃ
“যারা কুফরী করে আমি তাদের অন্তরে ভয়কে নিক্ষেপ করব। ঐ কারণে যে তারা আল্লাহর সাথে শিরক করছে, আর যে সম্বন্ধে আল্লাহ পাক কোন প্রমান পাঠাননি। তাদের ঠিকানা আগুন এবং জালেমদের জন্য সেটা কতই না নিকৃষ্ট জায়গা।” (সুরা আল ইমরানঃ ১৫১)
শিরকেরর কারণে নেক আমলগুলো নষ্ট হয়ে যায়-
কারণ সে তার অনুগামীদেরকে মাধ্যম ও শাফায়াতকারীর উপর ভরসা করতে শেখায়। ফলে নেক কাজগুলোকে সে ছাড়তে শুরু করে এবং গুনাহ করতে শুরু করে এই ধারণার বশবর্তী হয়ে যে সমস্ত অলীরা তাদের জন্য আল্লাহ পাকের কাছে সুপারিশ
করবে। এটা ইসলামের পূর্বের আরবদের বিশ্বাস। যাদের সম্বন্ধে আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা আল্লাহকে ছেড়ে এমন অন্যদের ইবাদত করে যারা না পারে তাদের ক্ষতি করতে আর না পারে কোন ভাল করতে এবং বলে, এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। বল (হে মুহাম্মাদ)! তোমরা কি আল্লাহকে আসমান ও জমিনের মধ্যে ঐ জিনিস শিখাতে চাও যা তিনি জানেন না। তারা যে সমস্ত শিরক করছে আল্লাহ পাক এর থেকে পবিত্র ও উচ্চ।” (সূরা ইউনুসঃ ১৮)
তাকিয়ে দেখ এই খ্রিষ্টানদের দিকে যারা একটার পর একটা অন্যায় কাজ করে যাচ্ছে এই ধারণার বশবর্তী হয়ে যে, ঈসা (আঃ) যখন শূলে চড়েছেন তখন তাদের সমস্ত গুনাহ মুছে দিয়ে গেছেন। আজ দেখা যায় অনেক মুসলমান ফরজ, ওয়াজিব ত্যাগ করছে এবং নানা ধরনের হারাম কাজ করছে। তা সত্ত্বেও এ ধারণা করে বসে আছে যে, রাসুল তাদের জান্নাতে প্রবেশের জন্য অবশ্যই শাফায়াত করবেন। কিন্তু রাসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আদরের কন্যা ফাতেমা (রাঃ)-কে বলেছেনঃ
“হে ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ (সঃ) তোমার যত টাকা দরকার তা আমার নিকট হতে চেয়ে নাও; কিন্তু আখেরাতে আল্লাহ পাকের হাত থেকে তোমাকে বাঁচানোর ব্যাপারে আমার কোন হাত নেই।” (বুখারী)
শিরক উম্মতকে টুকরো টুকরো করে দেয়-
আল্লাহ্ বলেনঃ অর্থাৎ, “তোমরা মুশরেকদের মত হয়ো না যারা তাদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করেছে এবং তারা দলে দলে ভাগ হয়ে গিয়েছে। প্রত্যেক দল তাদের কাছে যা আছে তাই নিয়ে খুশী।” (সূরা রূমঃ ৩১-৩২)
মূলকথাঃ অবশ্যই আগের এই সমস্ত যুক্তি পরিষ্কারভাবে এটাই ফুটিয়ে তুলেছে যে, শিরক খুব খারাপ কাজ, তাই এ থেকে বেঁচে থাকা ফরজ। তার থেকে দূরে সরে থাকা দরকার এবং তার মধ্যে ঢুকে পড়ার ব্যাপারে ভয় করা দরকার। কারণ, এটা সবচেয়ে বড় গুনাহ। তা বান্দার সমস্ত আমলকেই নষ্ট করে দেয়, এমনকি তার ঐ সমস্ত নেক কাজও যাতে উম্মতের উপকার হত, মানবতার সেবা হত। যেমন, আল্লাহ পাক বলেনঃ
“তাদের ঐ সমস্ত আমলকে আমার কাছে পৌছানো হবে কিন্তু সেগুলো আমি ধূলির মত উড়িয়ে দেব।” (সূরা ফুরকানঃ ২৩)

তাওহীদ ও শিরকের চিরকালীন দ্বন্দ্ব

তাওহীদ ও র্শিকের মধ্যে যুদ্ধ বহু পুরাতন। নূহ (আঃ) মূর্তি পূজা ছাড়াতে যখন তাঁর জাতিকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকছিলেন তখন থেকেই তা শুরু হয়। তিনি এভাবে সাড়ে ন’শত বছর পর্যন্ত দাওয়াত দেন। তারা যেভাবে তার বিরুদ্ধাচরণ করে সে সম্পর্কে কুরআন বলেঃ
“তার কওমের নেতারা বললঃ তোমরা কখনও তোমাদের দেবদেবীদের ছেড় না, না “ওদ্দা”, “সূয়া’য়”, “ইয়াগুছা”, ইয়া’য়ুকা”, নাছরা, যদিও এরা অনেককেই পথভ্রষ্ট করেছে।” (সূরা নূহঃ ২৩-২৪)
বুখারী শরীফে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে এই আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছেঃ এরা ছিলেন নূহ (আঃ)-এর জাতির মধ্যে ভাল ও নেককার লোক। যখন তারা মারা গেলেন তখন শয়তান তাদের জাতির লোকদের কাছে গোপনে বলল, তারা যেখানে বসত সেখানে তাদের প্রতিমূর্তি তৈরী করতে এবং তাদেরকে তাদের নামে বিভূষিত করতে। তারা তা করল। কিন্তু তখন পর্যন্তও তাঁদের ইবাদত করা হত না। যখন এই লোকেরা মারা গেল তখন কেন যে মূতিগুলো বানানো হয়েছিল তা লোকেরা ভুলে গেল; ফলে তখন থেকেই মূর্তি ও পাথরের পূজা শুরু হয়ে গেল।
তারপর নূহ (আঃ) এর পর যত রাসুলগণ (আঃ) এসেছিলেন প্রত্যেকেই এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকতে শুরু করলেন এবং ঐ সমস্ত মাবুদদের ত্যাগ করতে বললেন যাদের ইবাদত করা হত আল্লাহকে ছেড়ে আর যারা ইবাদত পাওয়ার যোগ্যতাই রাখে না।
কুরআন পাকে আল্লাহ্ বলেনঃ
“কওমে আ’দের কাছে আসলেন তাদের ভাই হুদ (আঃ) তিনি তাদের দাওয়াত দিয়ে বললেনঃ হে আমার জাতি, এক আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন উপাস্য নেই। তোমরা কি পরহেজগার হবে না?” (সূরা আ’রাফঃ ৬৫)
অন্যত্র বলেনঃ
“তাদের কওমে সামুদের কাছে এসেছিলেন তাদের ভাই ছালেহ (আঃ)। তিনি এই দাওয়াত দিতেনঃ হে আমার জাতি, আল্লাহ পাকের ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন উপাস্য নাই।” (সূরা হুদঃ ৬১)
অন্যত্র বলেনঃ
“মাদায়েনে আসলেন তাদের ভাই শুয়াইব (আঃ)। তিনি তাদের বললেনঃ হে আমার জাতি, আল্লাহ পাকের ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন উপাস্য নেই।” (সূরা হুদঃ ৮৪)
অন্যত্র বলেনঃ
“যখন ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর পিতা এবং জাতির লোকদের বললেন, অবশ্যই আমি ওদের থেকে সম্পর্কমুক্ত যাদের ইবাদত তোমরা কর। আমি শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করি যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি আমাকে সঠিক রাস্তা দেখাবেন।” (সূরা যুখরুফঃ ২৬-২৭)
মুশরিকরা সমস্ত নবীদের বিরোধিতা করত এবং অহঙ্কারের সাথে মুখ ঘুরিয়ে নিত। সাথে সাথে তাঁরা যে সমস্ত দাওয়াত নিয়ে আসতেন তার বিরুদ্ধেও যত ধরনের শক্তি তাদের ছিল তা দিয়ে তাঁদের বিরোধিতা করত।
এই আমাদের রাসুল (সঃ) যিনি আরবদের কাছে নবুয়ত পাওয়ার আগে বিশ্বাসী আল-আমীন বলে সুপরিচিত ছিলেন। কিন্তু যখনই তাদের এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকলেন এবং ঐ সমস্ত মূর্তির ইবাদত না করতে বললেন যা তাদের বাপ দাদারা করত, সাথে সাথে তারা তাঁর সত্যবাদীতা ও আমানতদারী ভুলে গেল। আর বলতে শুরু করলঃ তিনি মিথ্যাবাদী, তিনি যাদুকর। এই কুরআন পাক তাদের বিরোধিতা করে বর্ণনা করেছেঃ
“যখনই তাদের মধ্য হতে একজন ভয় প্রদর্শক আসলেন তখনই তারা অবাক হয়ে গেল, ফলে কাফেররা বলতে লাগলঃ এ যাদুকর এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে কি আমাদের সমস্ত মাবুদদের এক মাবুদ বানিয়ে ফেলতে চায়, এ তো বড়ই অবাক হওয়ার কথা।” (সূরা ছোয়াদঃ ৪-৫)
অন্যত্র বলেনঃ
“এভাবে যত রাসুল তাদের পূর্বে এসেছেন তাদেরকে তারা অবশ্যই বলেছে যাদুকর এবং পাগল। তারা কি একে অপরকে এই ব্যাপারে উপদেশ দিত? বরঞ্চ তারা হচ্ছে সীমালঙ্ঘনকারী।” (সূরা যারিয়াতঃ ৫২-৫৩)
এটাই হচ্ছে সমস্ত রাসুলের তাওহীদের দিকে দাওয়াত দেয়ার পরের অবস্থা। এটাই হচ্ছে তাঁদের মিথ্যাবাদী কওম ও অপবাদ দানকারীদের ভূমিকা।
আর আমাদের এই সময়ে যখন কোন মুসলমান তাদের ভাইদের দাওয়াত দেয় চরিত্র সংশোধন করতে, সত্য কথা বলতে এবং আমানতদারী ঠিক করতে, তখন তাতে কোন বিরোধিতার সম্মুখীন হয় না। আর যখনই ঐ তাওহীদের দিকে দাওয়াত দিতে শুরু করে যার দিকে সমস্ত রাসুলরা দাওয়াত দিয়েছেন, আর তা হল এক আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং তাঁকে ছেড়ে অন্য নবী এবং আউলিয়া (যারা আল্লাহর দাস) এদের কাছে দোয়া করতে নিষেধ করা, তখনই মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় এবং তাকে নানা ধরনের মিথ্যা অপবাদে জর্জরিত করতে থাকে।
যারা তাওহীদের দিকে মানুষকে ডাকবে তাঁদের অবশ্যই ধৈর্য ধরতে হবে। এবং ঐ রাসুল (সঃ)-এর অনুসরণ করতে হবে যাঁকে তার রব বলেছেনঃ
“তারা যা বলে তা তুমি সহ্য কর এবং তাদেরকে সুন্দরভাবে পরিত্যাগ কর।” (সূরা মুজাম্মেলঃ ১০)
অন্যত্র আয়াতে বলেনঃ
“তারা যা বলল তা সহ্য করতে থাক এবং তাদেরকে পাপের বা কুফরী কার্যে অনুসরণ কর না।” (সূরা ইনসানঃ ২৪)
মুসলমানদের উপর দায়িত্ব হচ্ছে তাওহীদের দিকে যে দাওয়াত দেয়া হয় তাকে কবুল করা এবং ঐ দাওয়াতকে ভালবাসা। কারণ, তাওহীদের দিকে দাওয়াত দেয়া সমস্ত রাসূলদের কাজ ছিল এবং আমাদের রাসুল (সঃ) এর দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। যে নবীকে ভালবাসে অবশ্যই সে তাঁর দাওয়াতকে ভালবাসবে। যে তাওহীদকে ঘৃণা করল সে যেন রাসুল (সঃ)-কেই ঘৃণা করল। আর কোন মুসলমানই কি এ কাজ করতে রাজী হবে?

শিরক কেন এত ভয়াবহ
শিরক মূলত এ পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যকেই অস্বীকার করে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য, এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেনঃ
“আমি মানব এবং জ্বিন জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।” (সূরা, যারিয়াত-৫১ঃ৫৬)
শিরকের মাধ্যমে আল্লাহর মর্যাদা এবং নিরংকুশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন করা হয়। আল্লাহ হচ্ছেন আমাদের রব এবং ইলাহ, আর আমরা হচ্ছি তার বান্দাহ বা দাস। যা কিছু আছে সবই আল্লাহর সৃষ্টি। শিরক্ করলে এই নগণ্য দাসকে/সামান্য সৃষ্টিকে স্রষ্টার স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এ জন্যই শিরক হচ্ছে আল্লাহর মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী, চরম যুলম-অবিচার। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেনঃ
“আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শিরক্ চরম যুল্ম।” (সূরা, লুকমান ৩১ঃ১৩)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা আরও বলেনঃ
“আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্যে একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেনঃ- তোমাদের আমি যে রিযিক্ দিয়েছি, তোমাদের অধিকারভূক্ত দাস-দাসীদের কেউ কি তাতে অংশীদার? ফলে তোমরা কি সমান? তোমরা কি তাদের সেরূপ ভয় করো যেরূপ তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভয় করো? আমি বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী বিস্তারিত বর্ণনা করি।” (সূরা, রূম ৩০ঃ২৮)
চাকর বা দাস-দাসী মনিবের ধন-সম্পদের অধিকারী হয় না, মনিব তাদেরকে ভয় করে না, সেরূপ মহান আল্লাহর সঙ্গে কোন সৃষ্টির কোন ব্যাপারে শরীকানা হয় না, হতে পারে না।
শিরক্ করলে আল্লাহর হক আল্লাহকে না দিয়ে অন্যকে দেয়া হয়। রাসুল (সঃ) বলেন- “বান্দার প্রতি আল্লাহর হক্ হচ্ছে বান্দা শুধু তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক্ করবে না।” (বুখারী হা/২৬৪৬)

শিরক না করার নির্দেশ এবং আহ্বান-
আল্লাহ সুবতানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না।” (সূরা, নিসা-৪ঃ৩৬)
“বিধান দেবার অধিকার কেবল আল্লাহরই। তিনি আদেশ দিয়েছেন অন্য কারও ইবাদত না করতে, কেবল তাঁর ব্যতীত; ইহাই শ্বাশ্বত দ্বীন কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ইহা জানেনা।” (সূরা, ইউসুফ ১২ঃ৪০)
“তোমরা আমার রব এবং তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত কর। কেউ আল্লাহর শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম।” (সূরা, মায়েদা-৫ঃ৭২)
“বল, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই, আমার প্রতি এই ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।” (সূরা-কাহফ-১৮ঃ১১০)
“(হে নবী) তুমি বল হে কিতাবীগণ! আস এমন একটি কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, যেন আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত না করি এবং কোন কিছুকে তাঁর শরীক না করি, আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ ব্যতীত নিজেদেরকে রব হিসেবে গ্রহন না করি। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে বল, তোমরা স্বাক্ষী থাক, অবশ্যই আমরা মুসলিম।” (সূরা, আলে ইমরান-৩ঃ৬৪)
আল্লাহতা‘য়ালা আরও বলেনঃ
“আর উহা এই যে, তুমি একনিষ্ঠভাবে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত হও এবং কখনও মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হইও না।” (সূরা, ইউনুস ১০ঃ১০৫)
মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেছেনঃ “আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক্ করো না, যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় কিংবা পুড়িয়ে মারা হয়।” (মুসনাদে আহমাদ)
শিরক না করার ফযীলত-
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ
“যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে যুলম (র্শিক) দ্বারা কলুষিত করে নাই, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই হেদায়েত প্রাপ্ত।” (সূরা, আন‘আম ৬ঃ৮২)
মুয়ায (রাঃ) থেকে বর্নিত তিনি বলেন- আমি উফাইর নামক একটি গাধার পিঠে নবী (সঃ) এর পেছনে বসেছিলাম। নবী (সঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কি জান বান্দার নিকট আল্লাহর হক্ কি? আমি বললাম আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ “বান্দাহর নিকট আল্লাহর হক্ হল বান্দাহ তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর বান্দাহর নিকট আল্লাহর অধিকার হলো তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করলে আল্লাহ তাকে শাস্তি প্রদান করবেন না। (বুখারী হা/২৬৪৬)
আবু যর (রাঃ) নাবী (সঃ) থেকে বর্ণনা করেন, নাবী (সঃ) বলেন- “জিব্রাঈল এসে আমাকে সুসংবাদ দিলেন, আল্লাহর সাথে শরীক্ স্থাপন না করে যে ব্যক্তি মারা যায় সে জান্নাত লাভ করবে। আবু যর বললেন, যদি সে চুরি করে এবং ব্যভিচার করে তবুও কি? নাবী (সঃ) বললেন, হ্যাঁ যদি সে চুরি করে এবং ব্যভিচার করে তবুও। (বুখারী হা/৯৬৯৬, মুসলিম হা/১৮০)
জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- এক ব্যক্তি নাবী (সঃ) এর নিকটে এসে জিজ্ঞেস করল, জান্নাত এবং জাহান্নাম ওয়াজিব কারী বস্তু দু‘টি কি কি? তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার না বানিয়ে মৃত্যুবরণ করল সে জান্নাতী। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক বানিয়ে মারা গেল সে জাহান্নামী। (মুসলিম হা/১৭৭)
আনাছ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সঃ) বলেছেন যে- ‘‘আল্লাহতা‘য়ালা বলেছেন: হে আদম সন্তান তোমরা যদি আমার সাথে অংশীস্থাপন না করে দুনিয়াভরা অপরাধ (গুনাহ) নিয়েও আমার সাথে স্বাক্ষাত কর, তবে আমি দুনিয়া ভরা ক্ষমা নিয়ে তোমাদের নিকট উপস্থিত হব। (তিরমিজী, মেশকাত, বা‘বুল ইস্তেগফার)

শিরক সম্পর্কে জানার প্রয়োজনীয়তা

তাওহীদ হচ্ছে ঈমান ও ইসলামের মূল ভিত্তি। তাওহীদ সকল নাবী-রাসুলের দাওয়াতের কেন্দ্রীয় বিষয়। আল্লাহর নিকট ইবাদত কবুলের শর্ত হচ্ছে তাওহীদ। বিপরীত দিকে শিরক হচ্ছে জঘন্যতম পাপ। শিরকের অপরাধীকে আল্লাহ ক্ষমা করেন না। শিরক যাবতীয় আমলকে নষ্ট করে দেয়, জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়। তাই আমাদের তাওহীদের পাশাপাশি শিরক সম্পর্কেও ইলম্ অর্জন করতে হবে। শিরক্ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে আমরা আমাদের অজ্ঞাতেই আল্লাহ না করুন শিরক জড়িয়ে যেতে পারি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ
“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।” (সূরা, যূমার ৩৯ঃ৯)
আমাদেরকে জানতে হবে শিরক কি? শিরক কিভাবে হয়, শিরকের কারণ কি? শিরকের পরিণাম ও ভয়াবহতা কি? তাহলেই আমরা শিরক থেকে সতর্ক ও সাবধান থাকতে পারব। ভাল কিছু জানলে যেমন তা অর্জন করার আগ্রহ থাকে, তেমনি খারাপ কিছু জানলে তা থেকে সতর্ক থাকার ইচ্ছা সৃষ্টি হয়। যার পরিণাম মন্দ ও ভয়াবহ তা জানলেই তা থেকে সতর্ক ও সাবধান থাকা যায়। তাই বিবেক-বুদ্ধির ফায়সালা হচ্ছে ভাল ও মন্দ দু’টিরই জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
প্রসিদ্ধ সাহাবী হোযাইফা (রাঃ) বলেনঃ লোকেরা রাসুল (সঃ) কে ভাল ও কল্যানের বিষয়ে জিজ্ঞেস করত, আর আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম মন্দ ও অনিষ্টের বিষয়ে, এতে জড়িত হয়ে যাওয়ার ভয়ে। (বুখারী)
মন্দ থেকে বাঁচার জন্য মন্দ সম্পর্কে জানতে হবে। অনিষ্ট থেকে সতর্ক থাকতে হলে তা জানতে হবে। হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হলে বাতিলকে জানতে হবে।ইসলামের উপর বলিষ্ঠভাবে টিকে থাকতে হলে র্শিক, কুফর ও জাহিলিয়্যাতকে পুরোপুরি চিনতে হবে। তা না হলে দৃঢ়ভাবে ইসলামের উপর টিকে থাকা যাবে না। এ জন্যই উমার (রাঃ) বলেছেনঃ ‘যে জাহিলিয়্যাত সম্পর্কে কিছু না জেনে ইসলামে(ইসলামী পরিবেশে) বেড়ে উঠেছে তার এই ইসলামের গিটগুলো একটি একটি করে ছিড়ে যাবে।(তাইসীরুল আজিজিল হামিদ পৃঃ১১৪)
শুধু তাওহীদের ইলমই যথেষ্ট নয়, শিরকের ইলম অর্জন করতে হবে। তাহলেই শিরক্ থেকে বাঁচা সহজ হবে। শিরক সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে আমাদেরকে অনেক শিরক আচ্ছন্ন করে ফেলবে অথচ আমরা বুঝতেও পারব না যে এগুলো শিরক।আর এসব শিরক্ আমাদের ঈমানকে ও যাবতীয় আমলকে বিনাশ করে দিবে।

শিরকের কারণ

কোরআন এবং সুন্নাহ থেকে আমরা এখানে র্শিকের ৬ টি কারণ উপস্থাপন করছি, যেন সকলে এগুলো জেনে শিরক থেকে বেঁচে থাকতে পারে-
আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা ও খারাপ মনেবৃত্তি পোষণ করা-
মন্দ ধারণাই শিরকের নেপথ্য কারণ। যে কোন শিরকের পেছনে আল্লাহ সম্পর্কে কোন না কোন দোষ-ত্রুটি ও মন্দ ধারণা কাজ করে। ভালবাসার বিপরীত এ মন্দ ধারণা পোষন করার কারণেই মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে অন্যেও ইবাদত করে। গায়রুল্লাহকে তার জন্য আল্লাহর চেয়ে অধিক দয়ালু ও কল্যানকামী মনে করে। আল্লাহ সম্পর্কে যারা মন্দ ধারণা পোষণ করে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ

“এবং মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারী যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষন করে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন। অমঙ্গল চক্র তাদের জন্য। আল্লাহ তাদের উপর রাগান্বিত হয়েছেন এবং তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন, তা কত নিকৃষ্ট আবাস।” (সূরা ফাতহ ৪৮ঃ৬)
মুশরিকদের এ মন্দ ধারণার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে তাওহীদের ইমাম ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর সূর্য্য, চন্দ্র, নক্ষত্র ও মূতি পুজারী জাতির সামনে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন পবিত্র কুরআনে তা এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে-
“তোমরা কিসের পুজা করছ? তোমরা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ মিথ্যা অলীক মা’বুদগুলোকে চাও? তাহলে বিশ্ব জাহানের রব সমন্ধে তোমাদের কি ধারণা?” (সূরা- সাফফাত ৩৭ঃ৮৫-৮৭)
এ কথার মর্ম হলো, তোমরা রাব্বুল আলামীনের মধ্যে কি ধরণের দোষ-ত্রুটি ও মন্দের ধারনা পোষণ করছ? যার ফলে তাকে পরিত্যাগ করেছ এবং তাঁর পরিবর্তে এতসব মা’বুদ ও দেবতা বানিয়ে নিয়েছ? আল্লাহর সত্ত্বা, তাঁর গুনাবলী ও কার্যাবলী সম্পর্কে কি ধরণের খারাপ মনোবৃত্তি পোষণ করছ? কি ধরণের দোষ-ত্রুটি তাঁর মধ্যে আছে বলে ধারণা করছ? কি ধরণের অক্ষমতা, অপারগতা, করুণার অভাব তাঁর মধ্যে আছে বলে তোমরা মনে করছ? যার ফলে সরাসরি তাঁর ইবাদত না করে ভায়া ও মাধ্যমের পুজা করছ এবং তাদের কাছেই কল্যাণের প্রত্যাশা করছ? এবং অকল্যাণ থেকে বাঁচার জন্য তাদের শরণাপন্ন হচ্ছ? ঊপরন্তু মুশরিকরা মনে করে যে, আল্লাহ তাদেরকে দয়া করবেন না। এজন্যই তারা মাধ্যম ও ভায়া মা’বুদের ইবাদত করে। আল্লাহর নিকট এসব ভায়া মা’বুদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে বলে বিশ্বাস করে। আল্লাহ তাদেরকে ভাল না বাসলেও ভায়া মা’বুদরা সুপারিশ করলে সে সুপারিশ আল্লাহ বাতিল করতে পারেন না।

সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমতুল্য করা-

আল্লাহর সাথে শিরকের কারণ হচ্ছে, সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমতুল্য করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-
“তাঁর সমতুল্য কোন কিছুই নেই এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা শুরা ৮২ঃ১১)
“তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” (সূরা- ইখলাস ঃ৪)
অথচ মানুষ দু’আ, ভয়, আশা-ভরসা, সিজদা, মানত, কোরবানী এসব ইবাদত গুলো এককভাবে আল্লাহর জন্য নিবেদন না করে সৃষ্টিকেও এসব ইবাদতে শরীক করছে। পীর, ফকির, মাজার, মুর্তি, মৃত অলী-আউলিয়াদের জন্য তারা এসব নিবেদন করার মাধ্যমে সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমতুল্য করছে। আল্লাহ আমাদের একমাত্র রব। অথচ মানুষ নবী, ফেরেশতা, জ্বীন, ওলী- আউলিয়া, পোপ-ফাদার, পুরোহিত, পীরবাবা, খাজাবাবা, দয়াল বাবা, কবর-মাজারস্থ মৃত ব্যক্তি, মুর্তি-দেবতার কাছে মানুষের লাভ-ক্ষতি, দান-বঞ্চনার ক্ষমতা আছে বলে মনে করে একমাত্র রব আল্লাহর সমতুল্য করছে। আল্লাহ একমাত্র আইন-বিধান দাতা, সার্বভৌমত্বেও মালিক অথচ মানুষ মানুষের জন্য আইন-বিধান দিয়ে সার্বভৌমত্বেও মালিক সাজছে। এমনি আরো অসংখ্যভাবে মানুষ সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমতুল্য করছে।

আল্লাহকে যথাযথ মর্যাদা না দেয়া-

শিরক মানে আল্লাহর সমস্ত মর্যাদাকে অস্বীকার করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ
“তারা আল্লাহর যথোচিত সম্মান করে না। কেয়ামতের দিন সমগ্র পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আকাশমন্ডলী ভাঁজ করা থাকবে তাঁর ডান হাতে। পবিত্র মহান তিনি। তারা যাকে শরীক করে তিনি তাঁর উর্দ্ধে।” (সূরা যূমার ৩৯ঃ৬৭)
আয়াতের “হাক্কা ক্বাদরিহী” অর্থ যথাযথ মর্যাদা, যেরূপ মর্যাদা দিতে হয় সেরূপ মর্যাদা। পরিপূর্ণ, অবিভাজ্য, অংশীদারমুক্ত মর্যাদা। সে মর্যাদার অপর নাম তাওহীদ, একত্ব, পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন। যে শিরক করল সে তাঁর মর্যাদা খন্ডিত করল, ভাগ করল, তাঁর মর্যাদার একাংশ অন্যকে দিল এবং আল্লাহকে দিল আংশিক মর্যাদা। আল্লাহকে যেরূপ মর্যাদা দেয়া উচিত সেরূপ মর্যাদা না দেয়ার কারণেই অনেকে আল্লাহর সাথে শিরক করে।

আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতা ও মুর্খতা-

শিরকের কারণ সমূহের মধ্যে এটি হল জননী বা মাতৃ কারণ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ
“বলুন, হে মূর্খরা! তোমরা কি আমাকে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করতে আদেশ করছ?” (সূরা, যুমার-৩৯ঃ৬৪)
“আল্লাহ এবং তাঁর একত্ব সম্পর্কে মূর্খতা সবচেয়ে বড় মূর্খতা। আর আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে জ্ঞান হচ্ছে সবচেয়ে বড় জ্ঞান। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ জেনে রেখো, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই।” (সূরা মুহাম্মদ-৪৭ঃ১৯)

কিভাবে আমরা আল্লাহ্র সাথে র্শিক করা হতে বিরত হব

আল্লাহ্’র সাথে র্শিক করা হতে বিরত থাকা কখনই পূর্ণ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা তিন ধরনের র্শিকের বাদ দিব।

রবুবিয়াতের ক্ষেত্রে শিরক-
এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ্ (সুবঃ) সাথে অন্য স্রষ্টা এবং পরিচালক আছে। যেমন কতিপয় পীর মনে করে থাকে যে, আল্লাহ্ (সুবঃ) দুনিয়ার কিছু কাজ কারবারকে কোন কোন আউলিয়ার হাতে সোপর্দ করেছেন, তারাই তা নির্বাহ করে থাকেন, যেমন কুতুবরা। এই ধারণা ইসলামের পূর্বের মুশরিকরা পর্যন্ত করে নাই যখন কুরআন তাদের প্রশ্ন করেঃ
“আর কে সমস্ত কাজ দেখাশুনা করে, তারা বলবে যে, আল্লাহ্।” (সূরা ইউনুস ১০ঃ ৩১)
লেখক বলেন, এক সূফী বলেছেনঃ আল্লাহ্র এমন বান্দাও আছে যদি সে বলে, হও, সাথে সাথে তা হয়ে যাবে। কিন্তু কুরআন তাদেরকে এই বলে মিথ্যাবাদী বলে যেঃ
“যখনই তিনি (আল্লাহ্) কোন কিছু করতে ইচ্ছা করেন তখন বলেন- হও, সাথে সাথে তা হয়ে যায়।” (সূরা ইয়াছিন ৩৬ঃ৮২)
“এবং আল্লাহ্ বলেনঃ “ওহে তাঁরই সৃষ্টি এবং হুকুমত।” (সূরা আরাফ ৭ঃ ৫৪)

ইবাদতের ক্ষেত্রে শিরক-
তা হল আল্লাহ্’র সাথে অন্যের ইবাদত করা, যেমন নবীদের এবং নেককার বান্দাদের। যেমন তার অসিলায় বিপদ মুক্তি চাওয়া এবং বিপদে পড়ে তাদের কাছে দোয়া করা এবং এই জাতীয় কার্য। বড়ই অনুতাপের বিষয় যে, এসব এই উম্মতের মধ্যে অনেক আছে এবং এ বিশেষ পাপ ঐ সমস্ত পীররা গ্রহণ করবে যারা এই জাতীয় শিরককে সাহায্য করে। অসিলা খোঁজার নামে তাকে অন্য নামে বিভূষিত করে। কারণ অসিলার অর্থ হল আল্লাহ্র কাছে কোন মাধ্যমকে খোঁজা। যেমন লোকেরা বলে যে, আল্লাহ্’র রাসূল সাহায্য করুন, হে আবদুল কাদের জিলানী সাহায্য করুন। আর এই চাওয়াটা ইবাদত। কারণ তা হল দোয়া এবং দোয়া হল ইবাদত।

তাঁর গুণের মধ্যে শিরক-
তা হল তাঁর কোন সৃষ্টিকে ঐ সমস্ত গুণে ভূষিত করা যা শুধু তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট। যেমন গায়েব (ভবিষ্যত) এর ইলম জানা। এই দলের মধ্যে অনেক পীররা অন্তভুর্ক্ত এবং যারা তাদের সাথে জড়িত আছে। যেমন বুছাইরী,নবী (সঃ)-এর প্রশংসাতে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার দয়াতেই দুনিয়ার ভাল, আর মন্দও তোমা হতে এবং তোমার ইলম হতেই কলম ও লওহে মাহ্ফুজের ইলম। এর থেকে পথভ্রষ্ট চরম মিথ্যাবাদীদের কথা এসেছে যারা ভুল ধারণা পোষণ করে যে, নবী (সঃ)-কে তারা জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পায় এবং তাঁকে ঐ সমস্ত গোপন (বাতেন) জিনিস সম্বন্ধে প্রশ্ন করে যা তারা জানে না। ঐ সমস্ত লোকদের গোপন কথা যাদের সাথে তারা ভালবাসা করে এবং যাদের কোন কোন কার্যে তারা হস্তক্ষেপ করতে চায়। এমনকি ঐ কথাও যা নবী (সঃ) তাঁর জীবিত অবস্থাতেও জানতেন না। যেমন আল্লাহ্ নবী (সঃ)-এর ব্যাপারে বলেনঃ
“যদি আমি গায়েব জানতাম তবে ভালকেই বাড়িয়ে নিতাম এবং কোন ক্ষতিই আমাকে স্পর্শ করতে পারত না।” (সূরা আ’রাফ ৭ঃ ১৮৮)
আর এটা কিভাবে সম্ভব তিনি তাঁর ওফাতের পর এই গায়েবকে জানেন যখন তিনি তাঁর উপরের বন্ধুর কাছে চলে গেছেন।
একদা নবী (সঃ) শুনলেন একটা বাচ্চা মেয়ে বলছেঃ এবং আমাদের মধ্যে এমন নবী আছেন যিনি আগামীকালের কথা জানেন। তখন নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ না, এ কথা বল না, ঐ কথাই বল যা বলছিলে।” (সহীহ বুখারী)

Advertisements
This entry was posted in ইসলাম এবং প্রচলিত প্রথা, ইসলাম এবং প্রচলিত ভুল ধারনা, ইসলাম ও সমাজ, ঈমান, তাওহীদ and tagged , , , , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s