হাদিসের আলোকে তাওাক্কুল পর্ব ৫

হাদিস ৯-

উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত -তার মূল নাম হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া হুযায়ফা আল মাখযুমিয়্যাহ-। (তিনি বলেন) নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম  যখন নিজ ঘর থেকে বের হতেন, বলতেন, “আল্লাহর নামে বের হলাম, তাঁর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করলাম। হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি, যেন আমি পথভ্রষ্ট না হই আর আমাকে যেন পথভ্রষ্ট করা না হয়। আমার যেন পদস্খলন না হয় বা পদস্খলন করা না হয়। আমি যেন কারো উপর অত্যাচার না করি বা করো দ্বারা অত্যাচারিত না হই। আমি যেন মুর্খতা অবলম্বন না করি বা আমার সাথে মুর্খতা সুলভ আচরণ না করা হয়।” বর্ণনায় ঃ আবু দাউদ, তিরমিজিসহ আরো অনেকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। তিরমিজির মতে হাদীসটি হাসান সহীহ। বর্ণনার এ ভাষা আবু দাউদ থেকে নেয়া।

হাদীসের শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. এ হাদীসে ঘর থেকে বের হবার একটি দুআ বর্ণিত হয়েছে। দুআটি হল :
্ بسم اللَّهِ، توكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أعوذُ بِكَ أنْ أَضِلَّ أو أُضَلَّ ، أَوْ أَزِلَّ أوْ أُزلَّ ، أوْ أظلِمَ أوْ أُظلَم ، أوْ أَجْهَلَ أو يُجهَلَ عَلَيَّ

দুই. ঘরে থাকা অবস্থায় যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম  আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল করে দুআ করেছেন, তাওয়াক্কুল করার ঘোষণা দিয়েছেন। তেমনি ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ও তাওয়াক্কুল করে দুআ পড়েছেন। তাওয়াক্কুল অবলম্বন করার ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাৎ ঘরে বাইরে সর্বত্রই আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে হবে। এটা এ হাদীসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আমরা যেন এমন ধারনা না করি যে, এখন আমরা আমাদের গৃহে খুব নিরাপদে আছি। নিরাপত্তার প্রতি কোনো হুমকি নেই। তাই আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করার তেমন প্রয়োজন নেই।

তিন. পথভ্রষ্ট হওয়া বা পদস্খলন ঘটা থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম  আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করেছেন সর্বদা।

চার. জালেম বা অত্যাচারী হওয়া ও মজলুম বা অত্যাচারিত হওয়া থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম  আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।

পাঁচ. মূর্খতা সুলভ আচরণ করা থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর আশ্রয় কামনা করেছেন। এমনিভাবে কারো থেকে মূর্খতাসুলভ আচরণের শিকার যেন না হতে হয়, সে জন্যও তিনি দুআ করেছেন।

হাদীস – ১০.

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন, “যখন কোনো ব্যক্তি নিজ ঘর হতে বের হওয়ার সময় বলে, ‘আল্লাহর নামে (বের হচ্ছি), আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করলাম। খারাপ বিষয় থেকে ফিরে থাকা আর ভাল বিষয়ে সামর্থ্য রাখা আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত সম্ভব নয়।’

তাহলে তাকে বলা হয়, ‘ তোমাকে সঠিক পথ দেখানো হল, তোমার জন্য যথেষ্ট হল, তোমাকে রক্ষা করা হল। আর শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়।”
বর্ণনায়ঃ আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসায়ী প্রমূখ।

আবু দাউদের বর্ণনায় আরো আছে যে, এক শয়তান অন্য শয়তানকে বলে, যে ব্যক্তিকে হেদায়াত দেয়া হয়েছে, যার জন্য আল্লাহর রহমত যথেষ্ট করা হয়েছে, যাকে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে তার ব্যাপারে তোমার করার কি আছে?

হাদীসের শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. ঘর থেকে বের হওয়ার আরেকটি ছোট দুআ এ হাদীসে বর্ণিত হল। দুআটি হল
بِسْم اللَّهِ توكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ ، ولا حوْلَ ولا قُوةَ إلاَّ بِاللَّهِ

দুই. দুআটি পাঠের ফজিলত জানতে পারলাম। যে ব্যক্তি ঘর থেকে বের হবার সময় দুআটি পড়ে বের হবে, সে সকল বিপদ-মুসীবত থেকে নিরাপদ থাকবে।

তিন. এ দুআ পাঠ করলে শয়তানের চক্রান্ত থেকে নিরাপদ থাকা যাবে।

চার. দুআটির মধ্যে তাওয়াক্কুল করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। দুআটি পাঠ করার সাথে সাথে সকল বিষয়ে ‘আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করলাম’ এ দৃঢ় প্রত্যয় থাকা জরুরী। শুধু মুখে বললাম, ‘আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করলাম’, আর অন্তর থাকল উদাসীন, তাহলে কাজ হবে না। এটা যেমন একটি  দুআ তেমনি ঘোষণা ও স্বীকারোক্তি।

হাদীস – ১১.

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে দুইভাই ছিল। তাদের একজন নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে সব সময় আসত আর অন্য জন জীবিকা অর্জনের কাজে ব্যস্ত থাকত। জীবিকা অর্জনে ব্যস্ত ব্যক্তি একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে অপর ভায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম  অভিযোগকারী কে বললেন, “সম্ভবত তোমাকে তার কারণে রিযক দেয়া হয়।”
বর্ণনায়ঃ তিরমিজি। ইমাম মুসলিমের শর্তে হাদীসের সূত্র সহিহ।

হাদীসের শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. হাদীসে দেখা যায় এক ভাই জীবিকা অন্বেষণে ব্যস্ত থাকত আর অন্য ভাই জীবিকা অর্জনে কাজ করত না, তবে সে শিক্ষা অর্জনের জন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আসা যাওয়া করত। কিন্তু এটা জীবিকা অর্জনে নিয়োজিত ভাইয়ের পছন্দ হতো না। তার কথা ছিল, আমি একা কেন উপার্জন করব। এ কারণে সে নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম  এর কাছে নালিশ দিয়েছিল।

দুই. নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিযোগকারীকে বললেন, তুমি যা অর্জন করে থাক সম্ভবত তা তোমার সেই ভাইয়ের কারণে আল্লাহ দিয়ে থাকেন, যে উপার্জন না করে আমার কাছে আসা যাওয়া করে থাকে।

তিন. যে উপার্জন না করে নবীজির দরবারে যাওয়া আসা করত সে জীবিকার জন্য আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করেছিল বলে আল্লাহর তার ভাইয়ের মাধ্যমে তাকে রিযক দিয়েছেন।

চার. এ হাদীস থেকে এ শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য নয় যে, এক ভাই উপার্জন করবে আর অন্যজন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করার নামে তার উপার্জন  থেকে খেয়ে যাবে। বরং উদ্দেশ্য হল, কর্ম বন্টন। যদি উভয়ে উপার্জনে লিপ্ত হয়ে পড়ে তাহলে শিক্ষা অর্জন করবে কে? আবার উভয়ে যদি নবীজির দরবারে শিক্ষা অর্জনের জন্য আসা যাওয়া করতে লাগে তাহলে উপার্জন করবে কে? তাই একজন উপার্জন করবে আর অন্য জন শিক্ষা অর্জন করবে। যাতে উভয়ে একে অপর থেকে লাভবান হতে পারে।

পাঁচ. জীবিকা অর্জনে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে দীনি ইলম অর্জনে মনোযোগ দেয়া অধিকতর ফজিলতের কাজ।

ছয়. যে সকল দুর্বল, অসহায়, প্রতিবন্ধী মানুষকে আমরা লালন পালন করে থাকি তাদেরকে নিজেদের উপর বোঝা মনে করা মোটেই সঙ্গত নয়। তাদেরকে বোঝা মনে না করে আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের একটি  মাধ্যম মনে করাই শ্রেয়। এটা এ হাদীসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম  অন্য হাদীসে বলেছেনঃ
“তোমরা তো রিযক ও সাহায্য পাচ্ছ একমাত্র তোমাদের দুর্বলদের মাধ্যমে”

অর্থাৎ আল্লাহ বহুমানুষকে রিযিক দিয়ে থাকেন তার অধীনস্থ দুর্বল, অসহায় মানুষের কারণে।

Advertisements
This entry was posted in তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s