হাদিসের আলোকে তাওাক্কুল পর্ব ১


আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার সম্মুখে সকল উম্মতকে পেশ করা হল। (এভাবে যে,) আমি একজন নবীকে ছোট একটি দলসহ দেখলাম। কয়েকজন নবীকে একজন বা দু’জন অনুসারীসহ দেখলাম। আরেকজন নবীকে দেখলাম তার সাথে কেউ নেই। ইতিমধ্যে আমাকে একটি বড় দল দেখানো হল। আমি মনে করলাম এরা হয়ত আমার উম্মত হবে। কিন্তু আমাকে বলা হল, এরা হল মূসা আলাইহিস সালাম ও তার উম্মত। আমাকে বলা হল, আপনি অন্য প্রান্তে তাকান। আমি তাকিয়ে দেখলাম, সেখানে বিরাট একটি দল। আবার আমাকে বলা হল, আপনি অন্য প্রান্তে তাকান। তাকিয়ে দেখলাম, সেখানেও বিশাল এক দল। এরপর আমাকে বলা হল, এসব হল আপনার উম্মত। তাদের সাথে সত্তর হাজার মানুষ আছে যারা বিনা হিসাবে ও কোনো শাস্তি ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ পর্যন্ত বলার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ঘরে চলে গেলেন। এরপর লোকেরা সেসব মানুষ- যারা বিনা হিসাবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে- তারা কারা হবে, সে সম্পর্কে আলোচনা শুরু করে দিল। কেউ বলল, এরা হচ্ছে, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহচর্য লাভ করেছে। আবার কেউ বলল, এরা হবে যারা ইসলাম অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করেছে আর আল্লাহর সাথে কখনো শরীক করেনি, তারা। এভাবে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে এসে বললেন, তোমরা কী বিষয়ে আলোচনা করছ ? সাহাবিগণ আলোচনার বিষয়বস্তু সম্বন্ধে তাকে জানালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তারা হচ্ছে এমনসব লোক যারা ঝাড়-ফুঁক করেনা। ঝাড়-ফুঁক চায়না। কোনো কুলক্ষণে-শুভাশুভে বিশ্বাস করেনা। এবং শুধুমাত্র নিজ প্রতিপালকের উপর তাওয়াক্কুল করে।” এ কথা শুনে উক্কাশা ইবনে মিহসান দাঁড়িয়ে বলল, আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত। এরপর আরেকজন উঠে বলল, আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “উক্কাশা এ ব্যাপারে তোমার অগ্রগামী হয়ে গেছে।”
(বর্ণনায় : বুখারি ও মুসলিম)

 

হাদীস থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :

এক. কেয়ামত সংঘটিত হবার পর হাশরের ময়দানে যা ঘটবে, তার কিছু চিত্র আল্লাহ আহকামুল হাকেমীন তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখিয়েছেন।

দুই. হাশরের ময়দানে উম্মতের সংখ্যার বিচারে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মত সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন। অন্য এক হাদীসে এসেছে তিনি উম্মাতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করবেন।

তিন. অনেক নবী এমন হবেন, যাদের কোনো অনুসারী থাকবে না। এটাকে তাদের ব্যর্থতা বলে গণ্য করা হবে না। কারণ তারা উম্মাতের হেদায়েতের জন্য যথাসাধ্য মেহনত করেছিলেন। ফলাফল তো তাদের আয়ত্বে ছিল না।

চার. উম্মতে মুহাম্মদীর থেকে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে যাবে। কারণ, তারা তাওয়াক্কুলের পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেছে।

পাঁচ. তাদের তাওয়াক্কুলের প্রকাশ ছিল এমন যে, তারা কারো ঝাড়-ফুঁক করেনি। ঝাড়-ফুঁকের জন্য কারো কাছে যায়নি। তারা অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস করেনি। অন্য বর্ণনায় আরেকটি গুণের কথা আছে। আর তা হল, তারা আগুনের ছ্যাকা দেয়নি।

ছয়. ইসলাম কোনো কিছুকে অশুভ লক্ষণ মনে করা অনুমোদন করে না। মানুষের সমাজে অনেক অশুভ লক্ষণের ধারনা আছে। যেমন, কালো বিড়ালকে অশুভ ভাবা হয়। তের সংখ্যাকে অশুভ ধরা হয়। কোনো কোনো তারিখকে অশুভ বলে গণ্য করা হয়। কখনো কখনো পশু পাখির হাক ডাককে অশুভ ধারনা করা হয় ইত্যাদি। যত প্রকার অশুভ লক্ষণ বলে মানুষ ধারনা করে, সব ইসলাম বাতিল করে দিয়েছে।

সাত. ঝাড়-ফুঁক দু ধরনের। শরিয়ত অনুমোদিত ঝাড়-ফুঁক আর শরিয়ত পরিপন্থী ঝাড়-ফুঁক। যে সকল ঝাড়-ফুঁক কোরআন বা সহিহ হাদীস অনুযায়ী হবে তা জায়েয। আর যা এর বাহিরে হবে তা শিরক বলে বিবেচিত হবে। যারা জায়েয ঝাড়-ফুঁক-কেও পরিহার করে চলে এ হাদীসে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে । না জায়েয ঝাড়-ফুঁকতো শুধু তাওয়াক্কুলেরই খেলাফ নয়। তা তাওহীদেরও খেলাফ। এ হাদীসে যে ঝাড়-ফুঁককে তাওয়াক্কুলের খেলাফ বলা হয়েছে তাহল জায়েয ঝাড়-ফুঁক। আর না জায়েয ঝাড়-ফুঁক করলে তো তাওয়াক্কুল দূরের কথা ঈমানই থাকে কিনা সন্দেহ।

আট. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী ও হাদীস নিয়ে গবেষণা করার বৈধতা প্রমাণিত হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কথা ও বাণী নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাতে বাধা দেননি। বরং সেই সত্তর হাজার লোক কারা হবে, তা প্রথমে বলেননি। বিষয়টি গোপন রেখে তাদের গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনা করতে উৎসাহিত করেছেন।

নয়. যে সকল ঝাড়-ফুঁক বৈধ, তাহল, কোরআনের আয়াত, হাদীসে বর্ণিত কোনো দুআ দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করা। কেউ এ রকম ঝাড়-ফুঁক করলে কোনো গুনাহ হবে না। যদি কেউ ঝাড়-ফুঁকের জন্য আসে তখন তাকে বৈধ পন্থায় ঝাড়-ফুঁক না করে ফিরিয়ে দেয়াও ঠিক হবে না।

দশ. ভাল কাজে সাহাবায়ে কেরাম প্রতিযোগিতা করতেন। কেউ পিছনে থাকতে চাইতেন না। উক্কাশা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর দুআ চাওয়া ও অন্যান্য সাহাবীদের এ মর্যাদা কামনা করার মাধ্যমে এটা আমাদের বুঝে আসে।

এগার. কোন নেককার আলেম, বুযুর্গ ব্যক্তিকে ‘আমার জন্য দুআ করুন’ বলা না জায়েয নয়। সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এ রকম বলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলে যাওয়ার পর সাহাবাগণ এ রকম বলতেন। যেমন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আব্বাস রা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত থাকাকালে আমরা দুআ করার সময় তার অসিলা নিতাম। মানে তাকে দুআ করতে বলতাম। এখন তিনি নেই। আমরা আপনার অসিলা নিচ্ছি, বৃষ্টির জন্য আপনাকে দুআ করতে অনুরোধ করছি।

Advertisements
This entry was posted in তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা and tagged , , , . Bookmark the permalink.

One Response to হাদিসের আলোকে তাওাক্কুল পর্ব ১

  1. Jashim বলেছেন:

    Jara valo kaj kore tara sawaber odhikari hay. Allah’r sontush orjon kore. Apnar kajti sokoler jonno, tai sadkar sawab paben bole bissashe raki.ah’r sontush orjon kore. Apnar kajti sokoler jonno, tai sadkar sawab paben bole bissashe raki.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s