হাদিসের আলোকে তাওাক্কুল পর্ব ৪

হাদীস – ৬.


উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, “তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথাযথ তাওয়াক্কুল (ভরসা) কর তাহলে তিনি তোমাদেরকে এমনভাবে রিযক দেবেন যেমন তিনি রিযক দেন পাখিদের। তারা সকালে খালি পেটে বের হয়ে যায় আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।” (বর্ণনায় : তিরমিজি)


হাদীসের শিক্ষা ও মাসায়েল


এক. হাদীসে সত্যিকার তাওয়াক্কুল করতে উৎসাহ দেয়া হয়েছে।


দুই. সত্যিকার তাওয়াক্কুল করলে আল্লাহ পাখিদের মত রিযক দেবেন। যাদের রিযক অন্বেষণে দু:শ্চিন্তা ও হা হুতাশ করতে হয় না। আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেছেন
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্যে যথেষ্ট।” (সূরা আত তালাক, আয়াত ৩)


তিন. পাখিরা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে ঘরে বসে থাকে না। তারা রিযক অন্বেষণে সকালে বেরিয়ে পড়ে। অতএব, তাওয়াক্কুল অর্থ বসে থাকা নয়। শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা-সাধনা করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর উপর নির্ভর করার নামই প্রকৃত তাওয়াক্কুল। যেমন আমরা দেখি এ পরিচ্ছেদে আলোচ্য হামরাউল আসাদ অভিযানে আল্লাহর রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবায়ে কেরাম কাফেরদের আক্রমণের কথা শুনে তাওয়াক্কুল করে মদীনাতে বসে থাকেননি। বরং তারা দু:খ, কষ্ট আর জখম নিয়ে শত্র“দের ধাওয়া করার জন্য বের হলেন।


হাদীস – ৭.

আবু উমারাহ বারা ইবনে আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে ব্যক্তি! তুমি যখন বিছানায় শয়ন করতে যাবে তখন বলবে, হে আল্লাহ! আমি আমাকে আপনার কাছে সমর্পণ করলাম। আমি আমার মুখ আপনার দিকে ফিরিয়ে দিলাম। আমার ব্যাপার আপনার কাছে সোপর্দ করলাম। আমার পিঠ আপনার কাছে দিয়েদিলাম। আর এ সব কিছু আপনার পুরস্কারের আশায় এবং শাস্তির ভয়ে করেছি। আপনি ব্যতীত কোনো আশ্রয় নেই। আপনি ব্যতীত মুক্তির কোনো উপায় নেই। আমি আপনার কিতাবের উপর ঈমান এনেছি যা আপনি নাযিল করেছেন। আপনার প্রেরিত নবীর প্রতিও বিশ্বাস স্থাপন করেছি ।
যদি তুমি (এ দুআটা পড়ে ) এ রাতেই মারা যাও তাহলে ইসলামের উপর তোমার মৃত্যু হবে। আর যদি সকালে জীবিত উঠ তাহলে কল্যাণ লাভ করবে।” (বর্ণনায়: বুখারি ও মুসলিম)


বুখারি ও মুসলিমের আরেকটি বর্ণনায় আছে – বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, আমাকে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন, যখন তুমি তোমার বিছানায় ঘুমাতে যাবে, তখন নামাজের অজু করার মত করে অজু করবে। তারপর ডান কাতে শুয়ে এ দুআটি পাঠ করবে। এটাই যেন তোমার ঐ দিনের শেষ কথা হয়।


হাদীসের শিক্ষা ও মাসায়েল


এক. নিদ্রা যাবার কিছু দুআ আছে। যার একটি হল:

اللَّهمَّ أسْلَمْتُ نفْسي إلَيْكَ ، ووجَّهْتُ وجْهِي إِلَيْكَ ، وفَوَّضْتُ أمري إِلَيْكَ ، وألْجأْتُ ظهْرِي إلَيْكَ . رغْبَة ورهْبةً إلَيْكَ ، لا ملجَأَ ولا منْجى مِنْكَ إلاَّ إلَيْكَ ، آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذي أنْزَلْتَ، وبنبيِّك الَّذي أرْسلتَ .


দুই. এ দুআটি পাঠের একটি ফজিলত হল, দুআটি পড়ে কেউ যদি নিদ্রা যায়। আর সে রাতে তার মৃত্যু হয়, তাহলে সে ইসলাম অনুসারী নিষ্পাপ হয়ে মৃত্যু বরণ করবে। আর যদি বেচে যায়, তাহলে সকালে সে কল্যাণ ও বরকত লাভ করবে।


তিন. সব সময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখা এ হাদীসের একটি শিক্ষা।


চার. এ হাদীসে বর্ণিত দুআর মধ্যে স্বীকারোক্তিগুলোর সবই সত্যিকার তাওয়াক্কুলের ঘোষণা। যেমন, হে আল্লাহ! আমি আমাকে আপনার কাছে সমর্পণ করলাম। আমি আমার মুখ আপনার দিকে ফিরিয়ে দিলাম। আমার ব্যাপার আপনার কাছে সোপর্দ করলাম। আমার পিঠ আপনার কাছে দিয়েদিলাম। আর এ সব কিছু আপনার শাস্তির ভয়ে এবং পুরস্কারের আশায় করছি। আপনি ব্যতীত কোনো আশ্রয় নেই। আপনি ব্যতীত মুক্তির কোনো উপায় নেই। একজন তাওয়াক্কুলকারীর দৃষ্টিভঙ্গি এ রকমই হতে হবে। সারাদিন তো বটেই। নিদ্রা যাবার নিরাপদ মুহূর্তেও তাকে আল্লাহ তাআলার প্রতি তাওয়ারক্কুলের চর্চা করতে হবে। এদিক বিবেচনায় হাদীসটি-কে তাওয়াক্কুল বিষয়ে উল্লেখ করা যথার্থ হয়েছে।


পাঁচ. নিরাপত্তাহীনতা ও বিপদ-আপদ, দুর্যোগ-সঙ্কটের সময় যেমন মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে থাকে, তেমনি ঘুমাতে যাওয়ার মত নিরাপদ অবস্থায়ও সে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের কথা ভুলে যায় না।


হাদীস – ৮.

আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, যার পুরো নাম ও পরিচয় হল, তিনি আব্দুল্লাহ বিন উসমান বিন আমের বিন উমর বিন কাআব বিন সাআদ বিন তাইম বিন মুররা বিন কাআব বিন লুআই বিন গালেব আল কুরাশি আত তায়মি রাদিয়াল্লাহু আনহু – তিনি ও তার পিতা-মাতা সকলেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবি-। তিনি বলেন, আমরা (হিজরতের সময়) গুহায় অবস্থানকালে আমি মুশরিকদের পা দেখতে পেলাম, যখন তারা আমাদের মাথার উপর ছিল। আমি তখন বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাদের কেউ যদি এখন নিজের পায়ের নীচে তাকায় তাহলে আমাদের দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, “হে আবু বকর! এমন দু ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কি ধারনা, যাদের তৃতীয় জন হচ্ছেন আল্লাহ?”
(বর্ণনায় – বুখারি ও মুসলিম)

হাদীস থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল


এক. সাহাবী আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর মর্যাদা ও ফজিলত জানা গেল। তিনি ও তার মাতা-পিতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী ছিলেন। তার বংশ আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বংশ একই ছিল।


দুই. হিজরতের সময় যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি গুহায় আত্মগোপন করেছিলেন তখন তাদের ধরতে আসা মক্কার মুশরিকরা এতটা নিকটে এসেছিল যে, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের পা দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর রহমতে মুশরিকরা তাদের দেখতে পায়নি। কারণ তারা উভয়ে আল্লাহর উপর এমন তাওয়াক্কুল করেছিলেন যে, আল্লাহ-কে তাদের তৃতীয়জন বলে বিশ্বাস করেছেন।


তিন. এমন বিপদের মুহূর্তেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম  আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল করতে ভুলে যাননি।

Advertisements
This entry was posted in তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s