ভূগোল-জাকির নায়েক,হারুন ইয়াহিয়া


পানি চক্র:

১৫০০ খ্রিস্টাব্দে বার্নার্ড পলিসি সর্বপ্রথম পানি চক্রের বর্তমান ধারনাটি ব্যাখ্যা করেন। তিনি সাগর থেকে পানির বাষ্পাকারে উড়ে যাওয়া এবং পরে তা ঠান্ডা হয়ে মেঘে পরিণত হবার প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করেন। মেঘমালা সাগর থেকে দূরবর্তী ভূ-খন্ডের ওপর ঘনীভূত হয় এবং ক্রমান্বয়ে তা বৃষ্টি আকারে নিচে পতিত হয়। এ পানি খাল-বিল ও নদ-নদীতে জড়ো হয় এবং পুনরায় সাগরে ফিরে আসে। খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীতে মিলেটুসের থেলেস এ মতবাদ পোষন করতেন যে, সমুদ্রের উপরিভাগে ছিটান পানিকনাকে বাতাস ধারন করে ওপরে তুলে নেয় এবং সমুদ্র দূরবর্তী স্থানে নিয়ে তা বৃষ্টি আকারে বর্ষণ করে।
আদিকালের লকেরা ভূগর্ভস্থ পানির উৎস সম্পরকে জানত না। তারা ভাবত যে, বাতাসের তাড়নায় সাগরের পানি সজোরে মহাদেশের অভ্যন্তরভাগে এসে পরে। তাত আরও বিশ্বাস করত যে। গোপন পথে কিংবা গভীর জলরাশি থেকে পানি পুনরায় ফিরে আসে যা সাগরের সাথে জড়িত। একে প্লেটোর যুগে “টারটারুস” বলা হত। এমনকি অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত চিন্তাবিদ ডিসকার্টিজ ও এই একি মন পোষণ করতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতেও এরিস্টটল তত্ত্ব সর্বত্র বিদ্যমান ছিল। এ তত্ত্ব অনুসারে , পাহাড়ের ঠান্ডা গভীর গুহায় পানি ঘনীভূত হয় এবং মাটি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হ্রদ ঝর্ণাগুলোকে পানি সরবরাহ করে। বরতমানে ,আমরা জানি যে, বৃষ্টির পানি মাটির ফাটল দিয়ে ভেতরে চুইয়ে পরার কারনে ওই পানি পাওয়া যায়।

কোরআনে নিচের আয়াত সমূহে পানিচক্রের বর্ণনা দেয়া হয়েছে-
“তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, অতঃপর সে পানি যমীনের ঝর্ণাসমূহে প্রবাহিত করেছেন, এরপর তদ্দ্বারা বিভিন্ন রঙের ফসল উৎপন্ন করেন, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তোমরা তা পীতবর্ণ দেখতে পাও। এরপর আল্লাহ তাকে খড়-কুটায় পরিণত করে দেন। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমানদের জন্যে উপদেশ রয়েছে।”[৩৯:২১]
“তাঁর আরও নিদর্শনঃ তিনি তোমাদেরকে দেখান বিদ্যুৎ, ভয় ও ভরসার জন্যে এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তদ্দ্বারা ভূমির মৃত্যুর পর তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমান লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।”[৩০:২৪]
“আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে থাকি পরিমাণ মত অতঃপর আমি জমিনে সংরক্ষণ করি এবং আমি তা অপসারণও করতে সক্ষম।”[২৩:১৮]
১৪০০ বছর আগে পানিচক্রের এই নির্ভুল বর্ণনা কোন বইয়ে ছিল না বা এই জ্ঞানও কোন মানুষের জানা ছিল না।

বাতাস মেঘকে পূর্ণ করে:

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন-
“আমি বৃষ্টিগর্ভ বায়ু পরিচালনা করি অতঃপর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, এরপর তোমাদেরকে তা পান করাই। বস্তুতঃ তোমাদের কাছে এর ভান্ডার নেই। ”[১৫:২২]
এখানে ব্যাবহৃত আরবি শব্দটি হচ্ছে “লাওয়াক্কিহ” যা “লাকিহ” শব্দের বহুবচন এবং এর উৎপত্তি “লাক্বাহ” থেকে যার অর্থ হচ্ছে পূর্ণ করা, গর্ভবতী করা বা উর্বর করা। এখানে পূর্ণ করার অর্থ হচ্ছে যে, বাতাস মেঘ তৈরি ও মেঘমালাকে ঘনীভূত করে। যার ফলে বৃষ্টিপাত হয়। কোরআনে এ একি বর্ণনা পাওয়া যায়।
এই আয়াত থেকে দেখা যায় বৃষ্টি তৈরীর প্রথম ধাপ হল বাতাস। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত বাতাস আর বৃষ্টিপাত এর মধ্যে কোন প্রকার সম্পর্ক কারো জানা ছিল না, কেবল মানুষ জানত বাতাস মেঘ কে ভাসিয়ে নিয়ে চলে মাত্র। কিন্তু আধুনিক আবহাওয়া গবেষনা থেকে বৃষ্টিপাতের জন্য বাতাসের ভূমিকা জানা যায়।
সমুদ্রপৃষ্ঠে পানির বাস্পীকরন এবং স্রোতের দ্বারা অসংখ্য বুদবুদ তৈরী হয়, এবং এই ছোট বুদবুদ গুলো ফেটে অনেক ছোট ছোট পানি কনা তৈরী হয় যাদের ব্যাস এক মিলিমিটার এর এক হাজার ভাগের একভাগের সমান। এই পানি কনা গুলো বাতাসের ধুলোকনার(বায়ু দ্বারা স্থল থেকে বহন করে আনা) সাথে মিশে বায়ুমন্ডলের উপরের স্তরে পৌছে যায়।সেখানে এই কনাগুলি বাষ্পের সংস্পর্শে আসে, এবং বাষ্প এই কনাগুলিকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হয়ে ছোট পানির বিন্দুতে পরিনত হয়।এইরকম পানির অনেক বিন্দু মিলে মেঘ তৈরী হয় যা থেকে পরে বৃষ্টিপাত হয়। দেখা যাচ্ছে বাতাসের এই ধুলিকনা বহন, তারপর তার মাধ্যমে পানিকনা কে বায়ুমন্ডলের উপরের স্তরে পৌছে দেয়ার কাজটি অত্যন্ত জরুরি, বাতাসের এই বৈশিষ্ট্য না থাকলে কখনই মেঘ তৈরী হতে পারত না, আর কখনই বৃষ্টি হত না।

“তিনি আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর তা মেঘমালাকে সঞ্চারিত করে। অতঃপর তিনি মেঘমালাকে যেভাবে ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে স্তরে স্তরে রাখেন। এরপর তুমি দেখতে পাও তার মধ্য থেকে নির্গত হয় বৃষ্টিধারা। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছা পৌঁছান; তখন তারা আনন্দিত হয়।”[৩০:৪৮]
“তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ মেঘমালাকে সঞ্চালিত করেন, অতঃপর তাকে পুঞ্জীভূত করেন, অতঃপর তাকে স্তরে স্তরে রাখেন; অতঃপর তুমি দেখ যে, তার মধ্য থেকে বারিধারা নির্গত হয়। তিনি আকাশস্থিত শিলাস্তুপ থেকে শিলাবর্ষণ করেন এবং তা দ্বারা যাকে ইচ্ছা আঘাত করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা, তা অন্যদিকে ফিরিয়ে দেন। তার বিদ্যুৎঝলক দৃষ্টিশক্তি যেন বিলীন করে দিতে চায়।”[২৪:৪৩]
“তিনিই বৃষ্টির পূর্বে সুসংবাদবাহী বায়ু পাঠিয়ে দেন। এমনকি যখন বায়ুরাশি পানিপূর্ন মেঘমালা বয়ে আনে, তখন আমি এ মেঘমালাকে একটি মৃত শহরের দিকে হাঁকিয়ে দেই। অতঃপর এ মেঘ থেকে বৃষ্টি ধারা বর্ষণ করি। অতঃপর পানি দ্বারা সব রকমের ফল উৎপন্ন করি। এমনি ভাবে মৃতদেরকে বের করব-যাতে তোমরা চিন্তা কর।”[৭:৫৭]
পানিবিজ্ঞানের আধুনিক মতবাদের সাথে কোরআনের বর্ণনাগুলো নিশ্চিতভাবে নির্ভুল এবং যথার্থভাবে একমত। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে পানিচক্রের বর্ণনা আছে-
“তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর স্রোতধারা প্রবাহিত হতে থাকে নিজ নিজ পরিমাণ অনুযায়ী। অতঃপর স্রোতধারা স্ফীত ফেনারাশি উপরে নিয়ে আসে। এবং অলঙ্কার অথবা তৈজসপত্রের জন্যে যে বস্তুকে আগুনে উত্তপ্ত করে, তাতেও তেমনি ফেনারাশি থাকে। এমনি ভাবে আল্লাহ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত প্রদান করেন। অতএব, ফেনা তো শুকিয়ে খতম হয়ে যায় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিতে অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ এমনিভাবে দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন।”[১৩:১৭]
“তিনিই স্বীয় রহমতের প্রাক্কালে বাতাসকে সুসংবাদবাহীরূপে প্রেরণ করেন। এবং আমি আকাশ থেকে পবিত্রতা অর্জনের জন্যে পানি বর্ষণ করি।তদ্দ্বারা মৃত ভূভাগকে সঞ্জীবিত করার জন্যে এবং আমার সৃষ্ট জীবজন্তু ও অনেক মানুষের তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে।”[২৫:৪৮-৪৯]
“আল্লাহই বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর সে বায়ু মেঘমালা সঞ্চারিত করে। অতঃপর আমি তা মৃত ভূ-খন্ডের দিকে পরিচালিত করি, অতঃপর তদ্বারা সে ভূ-খন্ডকে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করে দেই। এমনিভাবে হবে পুনরুত্থান।”[৩৫:৯]
“দিবারাত্রির পরিবর্তনে, আল্লাহ আকাশ থেকে যে রিযিক (বৃষ্টি) বর্ষণ করেন অতঃপর পৃথিবীকে তার মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করেন, তাতে এবং বায়ুর পরিবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।”[৪৫:৫]
“আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তদ্বারা বাগান ও শস্য উদগত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয়।এবং লম্বমান খর্জুর বৃক্ষ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খর্জুর,বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ এবং বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এমনিভাবে পুনরুত্থান ঘটবে।”[৫০:৯-১১]
“তোমরা যে পানি পান কর, সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি?তোমরা তা মেঘ থেকে নামিয়ে আন, না আমি বর্ষন করি? আমি ইচ্ছা করলে তাকে লোনা করে দিতে পারি, অতঃপর তোমরা কেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না? ”[৫৬:৬৮]

পাহাড় পর্বতগুলো তাঁবুর পেরেক সদৃশ:

ভূ-তত্ত্ববিদরা আমাদের বলেন যে, পৃথিবীর ব্যাস প্রায় ৩৭৫০ মাইল এবং ভূপৃষ্ঠের শক্ত যে উপরিভাগে আমরা বাস করি তা অত্যন্ত পাতলা, এর বিস্তার ১ মাইল থেকে ৩০ মাইল পর্যন্ত। যেহেতু উপরের এই পাতলা আবরণটি পাতলা সেহেতু এর আন্দোলিত হবার সম্ভাবনা খুব বেশি। পাহারগুলো খুঁটি কিংবা তাঁবুর পেরেকের মত ভূপৃষ্ঠকে ধারন করে এবং একে স্থিতি দান করে। কোরআনের নিচের আয়াতটি তে হুবহু এই কথাটিই বলা হয়েছে।
“আমি কি করিনি ভূমিকে বিছানা, এবং পর্বতমালাকে পেরেক?”[৭৮:৬-৭]
এখানে ব্যবহৃত আরবি শব্দ “অওতাদা” অর্থ হচ্ছে পেরেক বা খুঁটি।
“Earth” নামক বইটি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্ব বিষয়ে প্রাথমিক ও মৌলিক রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যাবহৃত হয়। এ বইয়ের অন্যতম লেখক হলেন ড. ফ্রাঙ্ক প্রেস, যিনি ১২ বছর ধরে অ্যামেরিকার বিজ্ঞান একাডেমীর প্রসিডেন্ট এবং প্রাক্তন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের বিজ্ঞান বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। এ বইয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে পাহাড়-পর্বত হচ্ছে পেরেকাকৃতি বিশিষ্ট এবং এগুলো অবিভক্ত বস্তুর এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, যার মূল মাটির গভীরে প্রোথিত। তার মতে, ভূপৃষ্ঠের আবরনকে স্থিতিশীল রাখতে পাহাড়-পর্বতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কোরআনে পাহাড়-পর্বতের সম্পরকে আরও কয়েকটি আয়াত লক্ষ করে দেখা যায়-
“আমি পৃথিবীতে ভারী বোঝা রেখে দিয়েছি যাতে তাদেরকে নিয়ে পৃথিবী ঝুঁকে না পড়ে এবং তাতে প্রশস্ত পথ রেখেছি, যাতে তারা পথ প্রাপ্ত হয়।”[২১:৩১]
“তিনি খুঁটি ব্যতীত আকাশমন্ডলী সৃষ্টি করেছেন; তোমরা তা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা, যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে”[৩১:১০]
কোরআনের বর্ণনা সম্পূর্ণরূপে আধুনিক ভূতত্ত্ব বৈজ্ঞানিক উপাত্তের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

পাহাড়- পর্বত দৃঢ় ভাবে ভূত্বকে প্রোথিত:

ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ বহুসংখ্যক মজবুত প্লেটে বিভক্ত । প্লেটগুলো আংশিক গলিত অংশে ভাসমান, যাকে এসথেনাস্ফিয়ার বলে।
পাহাড়- পর্বত প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায় তৈরি হয়। পৃথিবীর কঠিন আবরন সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৫, সমতল ভূমির প্রায় ৩৫ এবং পর্বতমালাগুলোর প্রায় ৮০ কিলো-মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর পাহার-পর্বত দাঁড়িয়ে আছে। নিচের আয়াতগুলোতে পাহাড়ের সুদৃঢ় ভিত্তির কথা বলা হয়েছে-
“পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন,”[৭৯:৩২]
“(তারা কি দেখে নয়া) পাহাড়ের দিকে যে, তা কিভাবে স্থাপন করা হয়েছে?”[৮৮:১৯]
“এবং তিনি পৃথিবীর উপর বোঝা রেখেছেন যে, কখনো যেন তা তোমাদেরকে নিয়ে হেলে-দুলে না পড়ে এবং নদী ও পথ তৈরী করেছেন, যাতে তোমরা পথ প্রদর্শিত হও।”[১৬:১৫]

Advertisements
This entry was posted in কোরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s