প্রশ্নঃ কেন দু’জনের সাক্ষী, যারা নারী- সমতূল্য মাত্র একজনের, যে পুরুষ ?

জবাব

ক. একজন পুরুষ সাক্ষির বিকল্প দুজন নারীর সাক্ষী সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

সাক্ষী প্রদান প্রসঙ্গে কুরআনের কমপক্ষে তিনখানি আয়াত রয়েছে যেখানে পুরুষ ও নারীর পার্থক্য করা হয়নি।

১. উত্তরাধিকারের ওসীয়ত করার সময় সাক্ষী হিসেবে দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে।

হে ঈমানধারনকারীরা! তোমাদের মধ্যে কেউ যখন মৃত্যুর দুয়ারে পৌছায় তখন অসীয়ত করতে হলে তোমাদের মধ্য থেকে সাক্ষী রেখো। তোমাদের নিজেদের মধ্যে থেকে দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যাক্তি অথবা বাইরের, যখন তোমরা এপৃথিবীর বুকে (কোথাও) সফরে আছো, আর এমন সময় মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়েছে। (সূরা মায়েদাঃ১০৬)

২.তালাকের ক্ষেত্রে দু’জন ন্যায়পরায়ন সাক্ষীর কথা বলা হয়েছে।

এবং সাক্ষীর জন্য তোমাদের মধ্যে থেকে দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে নাও। আর প্রতিষ্ঠিত করো এসাক্ষী শুধু আল্লাহর জন্য। (সূরা তালাকঃ২)

২. নারীর প্রতি ব্যভিচারের অভিযোগে চারজন সাক্ষী দাড় করাতে হবে।

আর যারা পবিত্র চরিত্রের নারীদের সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ আনবে। তারপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারবেনা (অভিযোগ প্রমানের জন্য) তাহলে তাদেরকে আশিবার বেত্রঘাত করো। আর কোনো দিন তাদের কোনো সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। আর এসব লোক তারাই যারা ফাসেক। (সূরা নূরঃ৪)

খ. টাকা পয়সা লেন-দেনের ক্ষেত্রে একজন পুরুষের স্থলে দুজন নারীর সাক্ষীর প্রয়োজন

একজন পুরুষের স্থলে দুজন নারীর সাক্ষীসর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য একথা সত্য নয় এর সত্যতা শুধু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে । সাক্ষী প্রসঙ্গে কুরআনে পাঁচ খানি আয়াত আছে যেখানে নারী কিংবা পুরুষ আলাদা করে উল্লেখ করা হয়ণি। আর একজন পুরুষের স্থলে দুজন নারীর সাক্ষির কথা মাত্র একখানি আয়াতে বলা হয়েছে সূরা বাকারা ২৮২ আয়াত। আয়াত খানির বিশেষ বৈশিষ্ট হলো কুরআনের দীর্ঘতম আয়াত এবং তা ব্যাবসা ও টাকা পয়সা লেনদেন সংক্রান্ত।

হে ঈমানদারগন যদি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য তোমরা একে অপরের সাথে লেন-দেন করো। তাহলে তা লিখে নিও —অতঃপর তোমাদের নিজেদের মধ্যের দুজন পুরুষকে সাক্ষী বানাও। তখন যদি দুজন পুরুষের আয়োজন না করা যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও যাদের সাক্ষীর ব্যাপারে তোমরা আস্থাশীল এমন দুজন নারী বেছে নাও যে একজন ভুলকরলে অন্যজন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। (সূরা বাকারাঃ২৮২)

এসব ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি লিখিত চুক্তির আদেশ করা হয়েছে এবং সেখানে দুজন সাক্ষীর কথা বলা হয়েছে। আর সে দুজনই পুরুষ হতে হবে। কিন্তু যদি সে রকম আস্থভাজন দুজন পুরুষ মানুষের ব্যবস্থা না করা যায় কেবল তখন, অন্ততঃ একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা থাকতেই হবে। এখানে একটা উদাহন প্রণিধানযোগ্য। ধরা যাক কেউ একজন তার একটি বিশেষ রোগের জন্য অপারেশন করতে মনস্থ করেছে। মোটামুটি নিশ্চিত হবার জন্য সে সমমানের দুজন শল্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিবে। কোনো কারণে যদি দুজন সার্জনের ব্যবস্থা করতে সে ব্যর্থ হয় তখন বিকল্প হিসেবে একজন সার্জন এবং দুজন সাধারণ এম বি বি এস-এর পরামর্শ গ্রহণ করল।

একইভাবে ব্যবসা ও ঋণ লেনদেনের ক্ষেত্রে দু’জন পুরুষকে সাক্ষী রাখতে বলা হয়েছে। ইসলাম চায় পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য উপার্জনের দায়ভার পুরুষ চহন করুক। অর্ধনৈতিক দায়-দায়িত্ব যেখানে পুরুষের কাঁধে ন্যাস্ত। পৃথিবীতে প্রচলিত সাধারণ বাস্তবতাও তাই। কাজেই অর্থনৈতিক লেন-দেনে নারীর তুলনায় পুরুষই সুদক্ষ।

বিকল্প হিসেবে যে, একজন পুরুষ ও দু’জন নারীর কথা বলা হয়েছে। তার কারণও স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে যে, একজন যদি কোনো ভুল করে তাহলে আর একজন যেন তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। কুরআন এখানে শব্দ ব্যবহার করেছে ‘তা’দিল’ যার মানে দালগোল পাকিয়ে ফেলা। অথবা ভুল করা। অনেকেই শব্দটির তরজমা করেছেন ‘ভুলে যাওয়া’ এটা শুদ্ধ নয়। যা হোক আর্থিক লেনদেনই একমাত্র বিষয় যেখানে সাক্ষী হিসাবে একজন পুরুষের বিকল্প দু’জন নারী।

গ. হত্যা মামলার ক্ষেত্রেও সাক্ষী হিসেবে একজন পুরুষের বিকল্প দুজন নারী

কিছু ইসলামী আইন-শাস্ত্রবীদগণের মতে, হত্যা মামলার সাক্ষী দানের ক্ষেত্রে নারীসুলভ অভিব্যক্তি প্রক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এধরনের পরিস্থিতিতে একজন পুরুষের তুলনায় একজন নারী বেশি মাত্রায় ঘাবড়ে যেতে পারে। তার নারী সুলভ ভাবাবেগ তাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিতে পারে। এ কারনেই কিছু বিশেষজ্ঞ আলেম খুনের মামলায় একজন পুরুষের বিকল্প হিসেবে দু’জন নারীর সাক্ষী এই রায় দিয়েছেন। অন্য সব ব্যাপারেই একজন নারীর সাক্ষী এক জন পুরুষের সাক্ষীর সমান মূল্যমানের।

ঘ. কুরআন সুস্পষ্ট ভাবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে-একজন নারীর সাক্ষী একজন পুরুষের সমান

কিছু বিশেষজ্ঞ আলেম যদিও এ ব্যাপারে জোরালো মতামত দিয়েছেন যে একজন পুরুষের সাক্ষীর বিকল্প দু’জন নারীর সাক্ষী বিষয়টা সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু নির্দ্বিধায় একথা মেনে নেয়া যায় না। কেননা খোদ কুরআনেই তা সমান করে দিয়েছে।

আর যারা তাদের স্ত্রীদের সম্পর্কে অভিযোগ তুলবে অথচ তাদের কাছে তাদের নিজেদের ছাড়া অন্যকোনো সাক্ষদাতা নেই। তাহলে তাদের একজনের সাক্ষ্যই চার বার (আল্লাহর নামে শপথ করে বললে) গ্রহণ যোগ্য হবে। (সূরা নূর ঃ ৬)

ঙ. হযরত আয়শা (রাঃ)-এর একক সাক্ষী হাদীসের বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য

মুসলমানদের কাছে কুরআনের পরেই নির্দেশনার জন্য মূল্যবান যে উৎস সেই হাদীস সমূহের মধ্যে হযরত আয়শা (রাঃ) বর্ণিত ২২২০ খানা হাদূস শুধু মাত্র তাঁর একক সাক্ষীর ওপরেই বিশুদ্ধতার সকল বিবেচনায় উত্তীর্ন। কাজেই ক্ষেত্র অনুযায়ী একজন নারীর সাক্ষীই যে গ্রহণ ও যোগ্য, এর জন্য আর কোনো দলিলের প্রয়োজন পড়েনা। ইসলামী আইন-শাস্ত্রবীদগণের অনেকেই এব্যাপারে একমত যে চাঁদ দেখার ব্যাপারে একজন “মো’মেনা” নারীর সাক্ষই যথেষ্ট। বিষয়টা অবশ্যই ভেবে দেখার মতো। ইসলামের একটি স্তম্ভ ‘রোযা’র কার্যকরিতার ব্যাপারে সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠি একজন মাত্র নারীর সাক্ষী দানের ওপরেই নির্ভর করতে পারে।

কোন কোন ইসলামী পন্ডিত বলেছেজন, রমযানের চাঁদ দেখার জন্য একজন সাক্ষী এবং রমযানের শেষের চাঁদ অর্থাৎ ঈদের চাঁদ দেখার জন্য দু’জন সাক্ষীর প্রয়োজন। সাক্ষীগণের পুরুষ বা নারী হওয়ার ব্যাপারে কোন শর্ত নেই।

চ. কোন কোন ক্ষেত্রে মহিলার সাক্ষী অগ্রগন্য

কোন কোন ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নারীর সাক্ষীই গ্রহণযোগ্য, সেখানে পুরুষের কোনো ভূমিকাই নেই। যেমন কেনো মহিলার মৃতদেহের গোসল করানোর সাক্ষী একজন নারীর পক্ষেই হওয়া সম্ভব।

দৃশ্যত সাক্ষীদানের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয় তা আদৌ লিঙ্গ বৈষম্যের জন্য নয়। তা বরং ইসলামের বিবেচনায় সমাজে নারী ও পুরুসের প্রকৃতি ও ভূমিকার পার্থক্যের কারণে।

Advertisements
This entry was posted in ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের ২০টি প্রশ্নের জবাব (ডা: জাকির নায়েক এর লেকচার). Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s