মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ এবং ইসলাম

সমসাময়িক আলোচনা কিংবা ধর্মসংক্রান্ত আলোচনায় সারসরি হোক কিংবা অন্যভাবে, মুসলিমদের প্রতি এই অভিযোগ উত্থিত হয়। ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে সব ধরনের প্রচারনা মাধ্যমগুলোতে এই দৃষ্টিভঙ্গী গভীরভাবে বদ্ধমূল যদিও তা সত্য নয়। যার ফলশ্র“তিতে এই মিথ্যা প্রচারনা মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষের জন্ম দেয়। উদাহরনস্বরূপ বলা যায়, আমেরিকার ওকলাহমায় যখন বোমা বিস্ফোরিত হয়, তখন আমেরিকার প্রচার মাধ্যমগুলো একতরফাভাবে মুসলিম বিদ্বেষী হয়ে একে মধ্যপ্রাচ্যের ষড়যন্ত্ররূপে আখ্যায়িত করে। পরবর্তীতে আমেরিকার সেনাবাহিনীর একজন সৈন্য এই ঘটনায় অপরাধী হিসেবে প্রমানিত হয়। মুসলিম জাতিকে এইসকল অপরাধে অভিযুক্ত করার আগে কে সংজ্ঞায়িত করা দরকার।

মৌলবাদীতা:
মৌলবাদী তাকেই বলা হয় যে নাকি একটি মৌলিক ধারণা বা বিশ্বাসকে সম্পূর্নভাবে অণুসরন করে। একজন ব্যক্তি যদি সুচিকিৎসক হতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই চিকিৎসাশাস্ত্রের জ্ঞানকে আক্ষরিকভাবে ও গভীরভাবে মেনে চলতে হবে। একজন ব্যাক্তি গনিতবিদ হতে চাইলে তাকে অবশ্যই মৌলিক গনিতশাস্ত্র বিশ্বাস করতে হবে ও তা মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ তাকে অংকশাস্ত্রের ক্ষেত্রে একজন মৌলবাদী হতে হবে। ভাল বিজ্ঞানী হবার জন্য একজন ব্যক্তির উচিৎ বিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র ও বিষয়গুলো জানা, অণুসরন করা এবং ব্যক্তিজীবনে তার প্রয়োগ করা।

প্রত্যেক মৌলবাদীই এক নয়:
সকল মৌলবাদীকেই একই কাতারে শামিল করা উচিৎ নয়। এবং কেউ সকল মৌলবাদীকে একতরফাভাবে ভালো কিংবা খারাপ কোনটাই বলতে পারবে না। একজন মৌলবাদী কোন বিশ্বাস বা নীতিবোধ মেনে চলে তার উপর ভিত্তি করে তার শ্রেণীবিভাগ করা হয়। একজন মৌলবাদী চোর বা ডাকাত তার কাজের মাধ্যমে সমাজের ক্ষতিসাধন করে এবং স্বভাবতই তা অনভিপ্রেত। কিন্তু অপরদিকে একজন মৌলবাদী চিকিৎসক সমাজের কল্যানের জন্য আত্মনিয়োগ করেন। তাই তার মৌলবাদীতা কাঙ্খিত।

একজন মুসলিম মৌলবাদী হিসেবে আমি গর্বিত:
আমি একজন মৌলবাদী মুসলিম কারণ আল্লাহর করুনায় আমি ইসলামের মৌলিক বিধি-নিষেধ জানি ও বুঝি এবং তা মানার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি। একজন প্রকৃত মুসলিম মৌলবাদী হবার কারনে কখনো লজ্জিত হয় না। আমি একজন প্রকৃত মুসলিম হিসেবে গর্বিত, কারণ আমি জানি যে ইসলাম সমগ্র জগতের এবং মানবজাতির জন্য কল্যান বয়ে এনেছে। ইসলামের এমনি কোন বিধান নেই যা সামগ্রীকভাবে মানুষের ক্ষতি করে বা মানব কল্যানের বিপক্ষে যায়। অনেক লোক ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারনা পোষন করে এবং ইসলামের কিছু নিয়ম বা শিক্ষাকে পক্ষপাতদুষ্ট ও ভুল বলে মনে করে। ইসলাম সম্পর্কে অপর্যাপ্ত ও ভুল জ্ঞানের কারনেই এমনটি হয়ে থাকে। কেউ যদি উন্মুক্ত মন নিয়ে গভীরভাবে ইসলামের নীতিমালা নিয়ে গবেষনা করে তাহলে তার অস্বীকার কারা উপায় থাকবেনা যে ইসলাম ব্যক্তি জীবনের এবং সামগ্রীক জীবনের জন্য কল্যাণকর জীবনব্যনস্থা।

মৌলবাদীতার আভিধানিক সংজ্ঞা:
’ওয়েবস্টার’ অভিধান অনুসারে ’মৌলবাদীতা’ হচ্ছে একটি আন্দোলন যা আমেরিকার প্রটেস্ট্যান্ট কর্তৃক বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক লগ্নে শুরু হয়েছিল। এই আন্দোলন ছিল আধুনিকতার বিরুদ্ধে এবং উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বাস, নৈতিকতা ও ইতিহাস হিসেবে বাইবেল সত্য ও চিরন্তন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখা। এই আন্দোলন বাইবেলকে স্রষ্টা থেকে আগত ধর্মগ্রন্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চেয়েছিল। অতএব মৌলবাদীতা আসলে একদল ব্যক্তির উপর আখ্যায়িত হয় যারা কিনা বাইবেলকে সকল ভুলের উর্ধ্বে স্রষ্টার নিজস্ব মুখনিঃসৃত বানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চেয়েছিল।

অক্সফোর্ড অভিধান অণুসারে মৌলবাদীতা বলতে প্রাচীন কোন ধর্ম বা কোন বিশ্বাসকে দৃঢ়তার সাথে ধারন করা বোঝায়- উল্লেখযোগ্যভাবে ইসলাম ধর্ম।

আজকে যখনই কোন ব্যাক্তি মৌলবাদী শব্দটি ব্যবহার করে তখনই তার মানসপটে একজন মুসলিম ব্যক্তির কথা মনে হয় যে কিনা সন্ত্রাসী।

প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির সন্ত্রাসী হওয়া উচিৎ:
একজন সন্ত্রাসী হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে কিনা ত্রাসের সৃষ্টি করে। যে মুহুর্তে একজন চোর পুলিশকে দেখে তখনই সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তা একজন ডাকাতের চোখে সন্ত্রাসী। একই ভাবে প্রত্যেক অসামাজিক কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের (চোর, ডাকাত, ধর্ষক) কাছে একজন মুসলিমের সন্ত্রাসী হওয়া উচিৎ। যখনই এসকল দু®কৃতিকারী ব্যক্তি কোন মুসলিমকে দেখবে তখনই তার ভয় পাওয়া উচিৎ। এটি সত্য যে সন্ত্রাসী শব্দটি তাদের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয় যারা সাধারন মানুষের মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি করে। কিন্তু একজন প্রকৃত মুসলিমের উচিৎ অসামাজিক কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের নিকট সন্ত্রাসী হওয়া এবং সাধারন নিরীহ জনগনের কাছে এই রূপ প্রদর্শন করা উচিৎ নয়। আসলে একজন সত্যিকারের মুসলিম সমাজের নিরীহ মানুষের নিকট শান্তির উৎস হিসেবে অবস্থান করতে হবে

একই ব্যক্তিকে একই কাজের জন্য বিভিন্ন নামে; অর্থাৎ সন্ত্রাসী ও দেশপ্রেমী হিসেবে আখ্যায়িত করা:
বৃটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পূর্বে ভারতের কিছু মুক্তিযোদ্ধাদের বৃটিশ সরকার সন্ত্রাসী রূপে আখ্যায়িত করে; যদিও তারা কোন নৃশংস কাজে জড়িত ছিল না। একই কাজের জন্য এইসকল ব্যক্তিদের ভারতবাসীরা ভালবাসে এবং তাদেরকে দেশপ্রেমিক হিসেবে সম্মান করে। এভাবে একই কাজের জন্য একই ব্যক্তিকে দুই ধরনের পরিচয় বহন করতে হচ্ছে। একদল তাদেরকে সন্ত্রাসী বলছে এবং অপরদল তাদেরকে দেশপ্রেমিক বলছে। যারা বিশ্বাস করে যে বৃটিশদের অধিকার রয়েছে ভারত শাসন করার; তারা এইসকল লোককে সন্ত্রাসী ভাবে এবং যারা মনে করে ভারত শাসনের ক্ষেত্রে বৃটিশদের কোন অধিকার নেই তাদের দৃষ্টিতে এরা দেশপ্রেমিক। এর থেকে বোঝা যায় একজন ব্যক্তিকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করার আগে নিরপেক্ষভাবে তার বক্তব্য শোনা উচিৎ এবং তার কার্যাবলী সম্পর্কে নিরপেক্ষ অণুসন্ধান করা উচিৎ। তারপর তার ব্যাপারে যেই রায় হয় তা সঠিক বলে গন্য করা উচিৎ।

ইসলাম শব্দের অর্থ হচ্ছে শান্তি:
ইসলাম শব্দটি সালাম থেকে এসেছে যার অর্থ হচ্ছে শান্তি। এই ধর্মের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে শান্তি এবং এর প্রকৃত অনুসারীরা বিশ্বব্যাপি শান্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। একই ভাবে প্রত্যেক মুসলিম হচ্ছে মৌলবাদী যারা তাদের শান্তির ধর্ম ইসলামের মৌলিক নীতিমালা আন্তরিকভাবে মেনে চলে। সে শুধুমাত্র সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অসমাজিক কাজে লিপ্ত ব্যাক্তিদের কাছে সন্ত্রাসীরূপে আবির্ভূত হয়।

Advertisements
This entry was posted in ইসলাম এবং প্রচলিত ভুল ধারনা and tagged , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s